বাংলাদেশের মানুষের বাহ্যিক দৈহিক আকৃতি ও বৈশিষ্ট্য পর্যালােচনায় কোন বিশুদ্ধ নরগােষ্ঠীর অস্তিত্ব দেখা যায় না। প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন জনগােষ্ঠীর মিশ্রন ও সমন্বয়ের মাধ্যমে বাঙালি জাতিগােষ্ঠীর সৃষ্টি হয়েছে। এদেশের কাউকে দেখে মনে হয় সে যেন ককেশয়েড, কাউকে নিগ্রোয়েড, কাউকে মঙ্গোলয়েড, কাউকে অস্ট্রালয়েড আবার কাউকে এদের কোনটার মধ্যেই ফেলা যায় না। ফলে বাঙালি একক কোন নৃতাত্ত্বিক জনগােষ্ঠী নয়। অধিকাংশ ঐতিহাসিকদের মত হলাে, বাঙালি একটি সংকর জাতিগােষ্ঠী। বিভিন্ন ধারার ও নৃতাত্ত্বিক জনগােষ্ঠীর মিশ্রণে আজকের বাঙালি জাতি।বিজ্ঞানীরা বলেন মানুষের দৈহিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনের পিছনে মুখ্য কারণ হলাে জৈবিক । এছাড়া সামান্য কিছু ভৌগােলিক কারণও দায়ী। প্রত্নতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী যেহেতু এই এলাকার মানুষের কোন জীবাশ বা ফসিল পাওয়া যায়নি। তাই এই দেশে।মানুষের বসতি কখন শুরু হয় তা জানার কোন উপায় নেই। তবে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে আদিম মানব সভ্যতার যেরূপ বিবর্তন ঘটেছিল ধরে নেয়া যেতে পারে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেরকমটি ঘটেছে।এদেশের পূর্ব এবং পশ্চিম প্রান্তে প্রাচীন ও নব্যপ্রস্তর যুগের এবং তাম্র যুগের নিদর্শন পাওয়া যায়। এসব যুগে বাংলার পার্বত্য সীমান্ত অঞ্চলেই মানুষ বসবাস করতাে এবং ক্রমে তারা সমতলভূমিতে ছড়িয়ে যায়।
বাঙালি জাতিগােষ্ঠীর মধ্যে যে সকল নৃতাত্ত্বি রক্ত ধারা এসে মিশেছে তা নিম্নে আলােচনা করা হলাে :

বাংলায় আগত জনগােষ্ঠীকে সাধারণত দু'ভাগে ভাগ করা যায়। (ক) প্রাক আর্য বা অনার্য নরগােষ্ঠী এবং (খ) আর্য নরগােষ্ঠী।

ক. আর্য নরগােষ্ঠী (Aryan) : আর্যরা এদেশে বহিরাগত জনগােষ্ঠী। তারা বাংলায় আগমন করে খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের আগে। উত্তর ভারতের গিরিপথ দিয়ে প্রবেশ করে আর্যরা ক্রমে সমগ্র উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এদেশে আর্যরা বৌদিক সভ্যতার জন্ম দেয়। লম্বা মাথা, সরু ও মাঝারি নাক, গায়ের রং ফর্সা, পুরুষদের দাড়ি গােফের প্রাধান্য এবং বলিষ্ঠ গড়ন আর্যদের প্রধান দৈহিক বৈশিষ্ট্য।

আগত অঞ্চলের ভিত্তিতে ভারতীয় উপমহাদেশে আগত আর্যরা দুটি নরগােষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল যথা- ১.আলপাইন জনগােষ্ঠী (Alpine) ও ২, নর্ডিক জনগােষ্ঠী(Nordic)। নিম্নে এদের সম্পর্কে আলােচনা করা হলাে :

১. আলপাইন জনগােষ্ঠী (Alpine) : নৃতত্ত্ববিদদের মতে, খ্রিস্টজনাের বহু আগে থেকেই পামির মালভূমি হতে একটি জনগােষ্ঠী ভারতীয় উপমহাদেশে এসে
বসবাস শুরু করে । নৃতত্ত্ববিদগণ এদের নাম দেন আলপাইন নরগােষ্ঠী। তবে এদেশের আলপাইন আর্যভাষী গােষ্ঠী ছিল ইন্দো-ইরানী গােষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এরা এশিয়া মাইনর হয়ে ভারতের পশ্চিম উপকূল হয়ে এদেশে প্রবেশ করে। এরা মাঝারি টাইপের দৈহিক
গড়নের, মাথার খুলি ছােট ও চওড়া, নাক লম্বা, মুখ গােল ও শ্যামলা গড়নের।

 ২. নর্ডিক জনগােষ্ঠী (Nordic) : নর্ডিক আর্যরা সাধারণভাবে গৌরবর্ণ, লম্বা,উন্নত নাক, কপাল ও ঘাড় লম্বা, দেহ লম্বা ও বলিষ্ঠ। সুইডেন, নরওয়ে, উত্তর জার্মান,ব্রিটেন ও রাশিয়ার কিছু লােক এ নৃগােষ্ঠীর অন্তর্গত। তবে এদেশে নর্ডিকরা আগমন করে উত্তর এশিয়ার তৃণভূমি অঞ্চল থেকে।

খ. অনার্য জনগােষ্ঠী (Non-Aryan) : আর্যদের আগমনের পূর্ব থেকে এদেশে বসবাসকারী জনগােষ্ঠী অনার্য নামে পরিচিত। সুপ্রাচীনকাল থেকেই এরা বাংলা অঞ্চলে বসবাস করে এসেছে। এরাই হচ্ছে বাংলার আদি জনগােষ্ঠী। অনার্য জনগােষ্ঠী আবার চারটি প্রধান শাখায় বিভক্ত। যথা : ১. অস্ট্রিক বা অস্ট্রালয়েড, ২. নেগ্রিটো, ৩. দ্রাবিড় ও ৪, মঙ্গোলয়েড।

১. অস্ট্রিক বা অস্ট্রালয়েড ও অস্ট্রেলিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার সংলগ্ন দ্বীপসমূহ থেকে আগত আদিম অধিবাসীদের অস্ট্রিক বা অস্ট্রালয়েড বলা হয়। ঐতিহাসিকদের মতে,অস্ট্রিকরাই এদেশের প্রাচীনতম বাসিন্দা। বর্তমানে বাঙালিদের মধ্যে এ নৃগােষ্ঠীর
প্রভাব সবচেয়ে বেশি। অষ্ট্রিকরা পাঁচ-ছয় হাজার বছর পূর্বে ইন্দোচীন হয়ে আসাম হয়ে বাংলায় প্রবেশ করে। এরা ভেডিডড এবং নিষাদ নামেও পরিচিত। এদের গায়ের রং গাঢ় কালাে, মাথার গড়ন লম্বা, নাক প্রশস্ত, উচ্চতা বেটে ও মধ্যমাকার। বাংলাদেশের কোল, ভীম, মুণ্ডা, সাঁওতাল, চণ্ডাল, জুয়া, কোরবু প্রভৃতি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের এ পর্যায়ভুক্ত বলা যায়। এ নৃগােষ্ঠীর লােকরা অস্ট্রিক ভাষায় কথা বলতাে। বর্তমান মুণ্ড বা মুণ্ডারী ভাষা আদি অস্ট্রিক ভাষার বিবর্তিত রূপ। সাঁওতাল, ভীম, জুয়াও, কোরকু প্রভৃতি উপজাতির লােক এ ভাষায় কথা বলে। কুড়ি, পণ, গণ্ডা, চোঙ্গা, ঠেঙ্গা, করাত,দা, কলা প্রভৃতি অস্ট্রিক ভাষার শব্দ।

২. নেগ্রিটো : নিগ্রোদের মতাে দেহ গঠনযুক্ত এক আদিম জাতির এ দেশে বসবাসের কথা অনুমান করা হয়। এদের নেগ্রিটো বা নিগ্রোয়েড বলা হয়। এদের আদি নিবাস ছিল আফ্রিকা। বিশেষ করে সাহারা মরুভূমির দক্ষিণে এবং মেলানেশিয়ায় এরা বসবাস করতাে। ঠিক কখন এরা ভারতীয় উপমহাদেশে বসবাস শুরু করে তা জানা যায় না। তবে এদেরকে বাংলার জনগােষ্ঠীর প্রথম স্তর হিসেবে চিহ্নিত করা হয় ।এদের গায়ের রং কালো, আকার খর্বাকৃতি, ঠোট পুরু ও উল্টানাে এবং নাক খুবই চ্যাপ্টা। আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ ও মালয় উপদ্বীপে নেগ্রিটো জনগোষ্ঠীর লােক বাস করতাে বলে জানা যায়। বর্তমান সুন্দরবন, যশােরের বাশফোড়, ময়মনসিংহ অঞ্চলের নিম্নবর্ণের জনগণের মধ্যে এলের প্রভাব লক্ষ্যণীয় ।।

৩. দ্রাবিড় । অস্ট্রিক ধাচের তার একটি গােষ্ঠী হলো দ্রাবিড়রা। অস্ট্রেলিয় আদিম অধিবাসীদের সাথে এদের মিল রয়েছে বলে এদরকে আদি অস্ট্রেলীয় বলা হয়। এরা ভূমধ্য সাগরীয় অম্বল থেকে এদেশে আগমন করে। এদের দেহ মধ্যমাকার, মাথা লম্বা,নাক চওড়া, গায়ের রং কালো থেকে বাদামি, চুল কালাে ও বাদামি এবং ঢেউ খেলানাে। এ জনগােষ্ঠী সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা। দক্ষিণ ভারতে এ গােষ্ঠীর লোকদের প্রাধান্য দেখা যায়।

৪. মঙ্গোলয়েড : পূর্ব এশিয়ায় মঙ্গোলীয় নরগােষ্ঠী বসবাস করে থাকে এককভাবে পৃথিবীতে বসবাসকারী মঙ্গোলীয় জনগােষ্ঠীর পরিমাণই অধিক। এ জনগােষ্ঠী দক্ষিণ ও পশ্চিম চীন থেকে এদশে আগমন করে। এদের গায়ের রং পীতাভ থেকে বাদামী, বেটে আকুতি, চুল কালাে ও ঋজু, মাথার আকৃতি গােল, নাক চ্যাপ্টা।
চোখের পাতা সামনের দিকে ঝােলানাে ! বাংলাদেশের লেপচা, ভুটিয়া, চাকমা, গারাে,হাজং, মুরং, মেচ, খাসিয়া, মগ, ত্রিপুরা, মিজো, মারমা ইত্যাদি ক্ষুদ্র নৃগােষ্ঠীরা এই নরগােষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।এছাড়া পরবর্তীকালে ধর্মপ্রচার ও ব্যবসা বাণিজ্য কিংবা দেশজয়ের সুবাদে এদেশে আরও বিভিন্ন রক্তধারার লােকদের আগমন ঘটে। মধ্য এশিয়া, পারস্য, ও
তুরস্ক থেকে আসা শক, তুর্কি, পাঠান, মােগল, ইরানি, আবিসিনীয়, আরব জনগােষ্ঠী এদেশে এসে বসবাস করার সুবাদে বাঙালি রক্তের সাথে তাদের সংমিশ্রণ ঘটেছে। পরে ইংরেজ, পুর্তগিজ এবং ওলন্দাজদের সাথে এতদাঞ্চ,-র মানুষের রক্ত ধারা মিশেছে।এভাবে দেখা যায়, বাঙালি কোন বিশুদ্ধ নৃগােষ্ঠীগত জাতি নয়। বাঙালি জাতি।গঠনে নানা ধরনের নরগােষ্ঠীর প্রভাব রয়েছে। অস্ট্রেলীয়রাই (অস্ট্রিক) হচ্ছে এদেশের প্রথম জনগােষ্ঠী। কারাে কারাে মতে, নিগ্রোটোদের হটিয়ে অস্ট্রিকরা এদেশে বসবাস শুরু করে। এরপর দ্রাবিড়রা এদেশে আগমন করে। সভ্যতায় উন্নত বলে এরা অস্ট্রিক জাতিকে গ্রাস করে। ঐতিহাসিকদের মতে, দ্রাবিড় ও অস্ট্রিকরা মিলে বর্তমান বাঙালি জাতির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ। তারপর প্রায় এখন থেকে আড়াই হাজার বছর পূর্বে আর্যদের দাপট পরিলক্ষিত হয়। আর্যরা এদেশের আদিবাসী অনার্যদের পদানত করে
এবং এদেশে বর্ণাশ্রম প্রথার সৃষ্টি করে। বাঙালি ব্রাহ্মণ, কায়স্থ ও বৈদ্যরা আর্যগােষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। মঙ্গোলীয়দের একটি অংশ এদেশে বসবাস করলেও বাঙালি নরগােষ্ঠীর মধ্যে তাদের প্রভাব অপেক্ষাকৃত কম। মঙ্গোলীয় জনগােষ্ঠীর পরে আসে শক জাতির লোেক
পারস্য ও তুর্কিস্থান থেকে। তাদের রক্ত মিশ্রিত হয় এ দেশে বসবাসরত অস্ট্রিক-দ্রাবিড়-আলপাইনীয় আর্যদের রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে। এ ছাড়াও এতদাঞ্চলে বিভিন্ন ব্যবসায়ী, ধর্মপ্রচারক, শাসক ও যাযাবর গােষ্ঠীর(তুর্কি,আরব,আফগান,আবিসিনীয়,ইরানী, মধ্য এশিয়ার মােঘল ইত্যাদি) আগমন ঘটেছে। তাদেরও রক্ত এদের রক্তের সাথে মিশেছে। ফলে বাঙালি হচ্ছে একটি সংকর জাতি। বর্ণসংকরতা বাঙালিদের মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন