স্যাটেলাইট যুগে বাংলাদেশ পদার্পন করেছে গত ১১ মে ২০১৮ সালে বিশ্বের ৫৭ তম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপক দেশ হিসেবে।দেখতে দেখতে ১ বছর পার হয়ে গেল।বাংলাদেশ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ নিয়ে বিভিন্ন তর্ক বিতর্ক আমরা সোস্যাল মিডিয়ায়  সেই প্রথম দিক থেকেই দেখে আসছি।বিভিন্ন  আলোচনা ও সমালোচনার কারনে স্যাটেলাইট সম্পর্কে প্রশ্ন উঠে আসছে অনেক।
যে সব দেশের স্যাটেলাইট আছে তার ভিতরে বাংলাদেশ ও নাম লিখিয়েছে।বঙ্গবন্ধু-১  স্যাটেলাইট বাংলাদেশের নতুন স্থান তৈরি করল বিশ্বের কাছে।

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে বাংলাদেশে সম্প্রচার ও টেলিযোগাযোগ সেবা পরিচালনার জন্য একনেক সভায়  ২৯৬৮(দুই হাজার নয়শত আটষট্টি)কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

এর ভিতরে ১৩১৫(তেরশত পনের) কোটি ৫১ (একপঞ্চাশ)  লাখ ১ হাজার টাকা বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।যা মোট ব্যয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশ।

১৬৫২ (ষোলশত বাওয়ান্ন) কোটি ৪৪ লাখ টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া হয় ‘বিডার্স ফাইন্যান্সিং’ এর মাধ্যমে এ প্রকল্পের জন্য। হংক সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশনের (এইচএসবিসি) সাথে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে সরকারের প্রায় একহাজার ৪০০ কোটি টাকার ঋণচুক্তি  হয়।এক দশমিক একান্ন শতাংশ(১.৫১%) হার সুদসহ ১২ বছরে ২০ কিস্তিতে এই অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

রাশিয়ার সংস্থা ইন্টারস্পুটনিকের কাছ থেকে অরবিটাল স্লট অনুমোদন দেওয়া হয় ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে। এর মূল্য ছিল ২১৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।

ফ্রান্সের থ্যালিস অ্যালেনিয়া স্পেস বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের নকশা ও তৈরি করেছে।এবং যুক্তরাষ্ট্রের ব্যক্তিমালিকানাধীন মহাকাশযান সংস্থা স্পেস এক্স থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু ১ স্যাটেলাইট টি।বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট টি ১১৯.১° ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমার ভূস্থির স্লটে স্থাপিত করা  হয়েছে।ফ্যালকন ৯ রকেটের মাধ্যমে!এবং এর আয়ু ১৫ বছর।১২ মে ২০১৮ তারিখ থেকে স্যাটেলাইটের পরীক্ষামূলক সংকেত পেতে শুরু করে বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটি  থেকে মোট তিন ধরনের সুবিধা পাওয়া যাবে।সুবিধা গুলো হলো-
১:বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের চল্লিশ টি ট্রান্সপন্ডারের মোট ফ্রিকোয়েন্সি ক্ষমতা হলো এক হাজার ছয়শত মেগাহার্টজ। এর ব্যান্ডউইডথ ও ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে ইন্টারনেট সুবিধা বঞ্চিত অঞ্চলে সেবা প্রদান করা যাবে।যেমন পার্বত্য ও হাওড় এলাকায় ইন্টারনেট সুবিধা দেয়া সম্ভব হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট ও ব্যাংকিং সেবা, টেলিমেডিসিন ও দূরনিয়ন্ত্রিত শিক্ষাব্যবস্থা প্রসারেও ব্যবহার করা যাবে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট টি।

২: বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট যখন বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মোবাইল নেটওয়ার্ক অচল হয়ে পড়ে।ঠিক তখন এর মাধ্যমে দুর্গত এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা চালু রাখা সম্ভব হবে।আর দূর্যোগকালীন সময়ে দেশের যোগাযোগ ব্যাবস্থাকে সচল রাখতে তৈরি করা হয়েছে।

৩:টিভি চ্যানেল গুলো তাদের সম্প্রচার কার্যক্রম ঠিক ভাবে পরিচালনা করার জন্য স্যাটেলাইট ভাড়া করে থাকে। এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট চ্যানেলের সক্ষমতা বিক্রি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে বলে আশা করা হয়।তবে তা আদৌ সম্ভব হবে কি না এটাই এখন প্রশ্নবিদ্ধ। আবার দেশের টিভি চ্যানেলগুলো যদি এই স্যাটেলাইটের সক্ষমতা কেনে তবে দেশের টাকা দেশেই থাকবে। এর মাধ্যমে ডিটিএইচ বা ডিরেক্ট টু হোম ডিশ সার্ভিস চালু করা সম্ভব হবে।

বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দেশের সকল টিভি চ্যানেলে সার্ভিস প্রদান করে এবং বিপুল পরিমানে অর্থ উপার্জন করা সম্ভব করা হবে এর ক্ষমতা কে ভাড়া দিয়ে।এটি আমাদের দেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সম্পুর্ন পাল্টে দিবে বলে আশা করা হয়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের ১ বছরের আয় ব্যায় হিসাব পেশ করেছে

২০১৮-১৯ অর্থবছরে বিসিএসসিএল ৭ প্রতিষ্ঠানকে বাণিজ্যিকভাবে সেবা দিতে শুরু
করে। পরীক্ষামূলকভাবে ছয়টি টেলিভিশন।
চ্যানেলসহ আরও তিন প্রতিষ্ঠানকে সেবা দেয়।এসব থেকে গত অর্থবছরের জুন পর্যন্ত তাদের আয় হয়েছে মােট দুই কোটি ৫৯ লাখ ৩৫ হাজার ৭৩২ টাকা। এ সময়ে স্যাটেলাইট ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন খাতে বিসিএসসিএলকে খরচ করতে হয়েছে ১৭ কোটি ৯৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা।এ টাকা গুনতে হয়েছে বাংলাদেশ টেলিযােগাযােগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি)।

সরকার বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট থেকে এ বছর আয় করেছে ২ কোটি ৫৯ লক্ষ ৩৫ হজার ৭৩২ টাকা।এবং স্যাটেলাইটের আয়ু ১৫ বছর।যদি এর দশ গুন আয় করা যায় আগামি ১৪ বছরে তাহলে এর থেকে আয় আসবে, ২,৫৯,৩৫,৭৩২*১০*১৪=৩,৬৩১,০০২,৪৮০ টাকা(তিনশত তেষট্টি কোটি দশ লক্ষ দুই হাজার চারশত আশি টাকা)
*হংক সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশনের (এইচএসবিসি) সাথে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে সরকারের প্রায় একহাজার ৪০০ কোটি টাকার ঋণচুক্তি  হয়।এক দশমিক একান্ন শতাংশ(১.৫১%) হার সুদসহ ১২ বছরে ২০ কিস্তিতে।তাহলে এর সুদ আসে,
(১৪০০*১.৫/১০০*১২)কোটি টাকা=২৫২ কোটি টাকা।
*মোট আয় থেকে সুদ বাদ দিলে লাভ থাকবে,
৩৬৩-২৫২=১১১ কোটি টাকা।
*রক্ষণাবেক্ষণ খরচ এ বছরে ১৭ কোটি ৯৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা।গড়ে ধরি ১৮ কোটি টাকা।যদিও যত দিন যাবে এর ব্যয় ততই বৃদ্ধি পাবে।তবুও গড়ে এর ব্যায় ১৮ কোটি টাকাই ধরা যাক।তাহলে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ আসে,১৮*১৫=২৭০ কোটি টাকা।
*তাহলে স্যাটেলাইট থেকে মোট খরচ হলো-
তৈরি খরচ-২৯৬৮ কোটি টাকা।
রক্ষণাবেক্ষণ খরচ-২৭০ কোটি টাকা।
লোনের সুদ-২৫২ কোটি টাকা।
মোট খরচ-৩৪৯০ কোটি টাকা।
*মোট আয়-৩৬৫.৫ কোটি টাকা(৩৬৩+২.৫ কোটি। আগামি বছর গুলোতে ১০ গুন আয় হিসাব করে)

*নীট ক্ষতির পরিমান ৩৪৯০-৩৬৫.৫=৩১২৪.৫ টাকা।

*আমাদের দেশ যেখানে ৮০%+ লোক দিন মজুর।আয়তনে ক্ষুদ্র এবং কেবল উন্নতির দিকে এগোচ্ছে এই সময়ে স্যাটেলাইটের মত পদক্ষেপ কে কতটা যুক্তি যুক্ত মনে করেন?যেখানে রয়েছে এই বিপুল পরিমান লোকসান।

বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট যেসকল দেশে স্যাটেলাইট সুবিধা দিতে পারবে তা হলো কে-ইউ ব্যান্ডের আওতায় রয়েছে বাংলাদেশ, বঙ্গোপসাগরে তার জলসীমাসহ ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া অঞ্চল।
তবে বাংলাদেশে বাদে সকল দেশেরই নিজস্ব স্যাটেলাইট রয়েছে।তাহলে তারা কি বাংলাদেশ থেকে সেবা গ্রহন করতে কতটা আগ্রহি হবে?

আর এই স্যাটেলাইটের কার্যক্ষমতা সম্পর্কে তো বিস্তারিত জানতেই পারলাম!

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন