টেলিভিশন এমন একটি যন্ত্র যা থেকে একই সঙ্গে ছবি দেখা যায় এবং শব্দ শোনা যায়। 'টেলিভিশন' শব্দটি ইংরেজি তবে শব্দটি এসেছে গ্রীক শব্দ "Tele"- টেলি অর্থাৎ দূর এবং ল্যাটিন শব্দ "Vision"-ভিশন অর্থ দর্শন। তাই এর শাব্দিক অর্থ দাড়ায় দূর দর্শন।
টেলিভিশন আবিষ্কার
পৃথিবীর অন্য এক প্রান্ত মেক্সিকোর মখমলসমান সবুজ ময়দানে এ কালের এক শ্রেষ্ঠ ফুটবল শিল্পী দিয়াগাে মারাদোনা অনবদ্য কুশলতায় সর্পিল গতিতে বল নিয়ে ছুটছেন বিপক্ষ ইংরেজ দলের গােলমুখে।

একে একে শরীরের মােচড়ে পায়ের সূক্ষ্মকাজে তিন তিন জন ইংরেজ ডিফেণ্ডারের মরিয়া প্রতিরােধকে তছনছ করে দিয়ে শেষ প্রহরী গােল রক্ষককেও পরাস্ত করলেন। 

আনন্দে-উল্লাসে শূন্যে ভেসে উঠলাে হাজার হাজার সহর্ষ দর্শকের অভিনন্দনসহ মারাদোনা নামটি।  আর তখন পৃথিবীর আর এক কেন্দ্র শহর ঢাকার বাড়িতে বসে দূরদর্শনের পর্দায় আমরা সমগ্র ঘটনাটি রুদ্ধশ্বাস আগ্রহে, বিস্ময়ে নিরীক্ষণ করলাম।

☑ ডার্ক ওয়েব রহস্য উদ্ঘাটন!

মারাদোনার ফুটবল কৌশল যেমন আশ্চর্য দৃশ্য, একটি ছোট্ট ইলেকট্রনিক্স পর্দায় তা সরাসরি ফুটে ওঠাটা কম বিস্ময়কর নয়।

চাদের বুকে যখন প্রথম মানুষের হাটি হাটি পা পা করে পৌছে যায়, লক্ষ চল্লিশ হাজার মাইল দূরে, মহীমণ্ডলের পৃষ্ঠে বসে আমরা ওই টেলিভিশনের স্ক্রিনেই সেই ঐতিহাসিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি।

বেতার ও টেলিফোনের পর টেলিভিশন দূরকে আরাে কাছে যুগপৎ চোখ ও কানের সামনে এনে দেখাচ্ছে, শােনাচ্ছে।
নিঃসন্দেহে টেলিভিশন বিজ্ঞানের আশ্চর্যতম আবিষ্কারগুলির অন্যতম। বর্তমানে টেলিভিশন আগের রেডিওর মতন এ দেশের ঘরে ঘরে পৌছে গেছে।

বিনা তারে যেমন শব্দ পাঠানাে যায়, তেমনি টেলিভিশন হল বিদ্যুৎ তরঙ্গের মারফৎ সুদূরের দৃশ্যনিচয়কে মানুষের চোখের সামনে উপস্থাপিত করবার আধার।

বিনা তারে যেদিন শব্দ প্রেরণ বাস্তবায়িত হল, হয়তাে সেই দিনই কেনাে কোনাে বিজ্ঞানীর মনে হয়েছিল, বিনা তারে তারা হয়তো ছবিকেও এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চালান দিতে পারবেন। 

পরিকল্পনাটা বহু বিজ্ঞানীর মাথায় থাকাতে পৃথিবীর নানা প্রান্তে নানা জন এ নিয়ে তৎপর হয়ে উঠলেন। চলছে এক ধরনের প্রতিযোগিতা। সকলেই প্রথমে বাজিমাত করতে চাচ্ছেন৷ 

প্রথম যিনি বিদ্যুতের মারফৎ একটি ছবিকে এক স্থান হতে অন্যস্থানে প্রেরণ করতে সফল হলেন, তাঁর নাম ফর্ণ। জাতিতে জার্মান। 

১৯২২ খ্রীষ্টাব্দে ফর্ণ সাহেব ইতালীতে বসে ইংল্যাণ্ডে কতগুলি ছবি দেখতে সক্ষম হলেন। যদিও ছবিগুলি নিশ্চল, শব্দহীন, তথাপি ফর্ণের কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ।

ফর্ণের আবিষ্কার ব্যাপারটাকে আরাে উন্নত ও কার্যকরী করে তুলেলেন আমেরিকার বিজ্ঞানী রেঞ্জার ।

রেঞ্জার তাঁর কৃতিত্ব দেখালেন এক সমুদ্রের এপার থেকে ওপারে বিদ্যুৎ তরঙ্গ মারফৎ কয়েকটি ছবি পাঠিয়ে। সমুদ্রের নাম আটলান্টিক। নিউইয়র্কের ছবি দৃষ্ট হলাে হনলুলুর সবুজ আঙিনায়। একেবারে মার মার কাট কাট ব্যাপার। বহুজনের ব্যাকুল বিস্মিত চোখ। 

টেলিভিশনের দিকে আবিষ্কারক মানুষের সেটা হলাে এক বেশ বড়সড় পদক্ষেপ।

আর মাত্র চার বছর। তারপর ১৯২৮ খ্রীষ্টাব্দে ইংরেজ বিজ্ঞানী লােগি বেয়ার্ড আদত টেলিভিশন আবিষ্কার করে ফেলেন ।
সর্বসমক্ষে দীপ্ত রােদে অনেকের চোখের সামনে তিনি ওই বৈজ্ঞানিক ভেলকি দেখালেন। তিনি আছেন একক একটি ঘরে, যেখানে বিভিন্ন যন্ত্রপাতির কাটাকুটি ও যে ঘর প্রায়ান্ধকার, সূর্যের বিভাও সীমিত।

আর তাঁর কাজ দেখতে এসেছেন যারা, তারা জমায়েত বেশ দূরত্বে অন্য একটি বাড়িতে। ওই বাড়িতে দর্শকবৃন্দের সামনে বেয়ার্ড আগেই একটি যান্ত্রিক কাঠামাে ও পর্দা টাঙিয়ে রেখে এসেছেন। 

সুদীর্ঘ নিঝুম প্রতীক্ষার পর, দর্শকরা সহর্ষ বিস্ময়ে দেখলেন ওই পর্দার ওপর বিলম্বিত হয়ে ফুটে উঠল একটি পূর্ণ দৈর্ঘ্যের মানুষ। 

না, এ নিছক ছবি নয় । এ এক জীবন্ত সচল মানুষ, যার চলাফেরায় কোন জড়ত্ব নেই, চোখের পাতা পিট পিট করে, বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি ও কটাক্ষ করে দেখায়।

ওই রকম জীবন্ত প্রতিরূপ তারা ইতিপূর্বে কেবল মাত্র সিনেমার বড় পর্দায় প্রত্যক্ষ করেছেন। 

সকলে বিস্ময়ে চিত্রার্পিত। খবরটা প্রকাশ হয়ে যায় । সকলেই এক বাক্যে স্বীকার করলেন, টেলিভিশনের আবিষ্কারক হলেন লােগি বেয়ার্ড। বেয়ার্ড তাঁর জীবদ্দশাতেই দূরদর্শনের অনেকটা উন্নতি করে যেতে সমর্থ হন। 

পরবর্তী পর্যায়ে মার্কিনী বিজ্ঞানী জোরকিন এতে আরাে মাধুর্য ও শক্তি দান করেন। বর্তমানে ডিভিকন, ইমেজ আর্থিকন, আর্থিকন ইত্যাদি যন্ত্রের ব্যবহারে টেলিভিশন আরাে সূচারু ও বর্ণময় হয়ে উঠেছে। 

বিবিসি প্রথম টিভি সম্প্রচার শুরু করে ১৯৩৬ সালে, রাশিয়ান বিজ্ঞানী আইজান শোয়েনবার্গের কৃতিত্বে। আর বাণিজ্যিকভাবে টেলিভিশন চালু হয় ১৯৪০ সালে৷ 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এর উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হতে থাকে। বিস্ময়কর এ যন্ত্রটি পূর্ণতা লাভ করে ১৯৪৫ সালে। 

গত শতাব্দীর ৫০ এর দশকে টেলিভিশন গনমাধ্যমের ভূমিকায় উঠে আসে এবং বর্তমানে এটি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী গণমাধ্যম।  

তবে প্রেরক কেন্দ্র থেকে টেলিভিশন সেটটির দূরত্ব খুব বেশি হলে ছবিকে আর স্পষ্ট দেখা যায় না। বস্তুত আশি-নব্বই কিলাে মিটারের বাইরে ছবি
দেখাই যাবে না।

এই অসুবিধে দূর করবার জন্য রিলেসেন্টার খােলা হচ্ছে। আবার পৃথিবীর এক কেন্দ্র থেকে ছবি পাঠাবার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে কৃত্রিম উপগ্রহকে ।

ঐ ব্যবস্থার সূচনা হয় ১০ই জুন, ১৯৬২, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র টেলস্টার নামক একটি কৃত্রিম উপগ্রহকে কক্ষপথে স্থাপন করে। উপগ্রহটির মাধ্যমে অ্যামেরিকা, ইংল্যাণ্ড এবং ফ্রান্স পরস্পরের সঙ্গে দূরদর্শন সম্পর্ক গড়ে তােলে।
১৯৬২ সালেরই ১৩ই ডিসেম্বর অ্যামেরিকা 'রিলে' নামক আর একটি উপগ্রহকে পৃথিবীর কক্ষপথে প্রেরণ করে, যা তামাম ইউরোপ, আমেরিকা ও ব্রাজিলকে দূরদর্শন সূত্রে ঐক্যবদ্ধ করে।

এরপর ক্রমাগত আরাে বহু উপগ্রহকে পাঠানো হয়েছে। আমরাও ২০১৮ সালের ১১ই মে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রেরণ করি। যা যোগাযোগ ও সম্প্রচার উপগ্রহ হিসেবে আমাদের দেশের অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা পালন করছে।

��একটি মন্তব্য করুন��

নবীনতর পূর্বতন