বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

ইংল্যান্ড হল বর্তমান যুক্তরাজ্য বা গ্রেট ব্রিটেনের (Great Britain) অংশ। ইংল্যান্ডের আয়তন গ্রেট ব্রিটেন দ্বীপের দক্ষিনাংশের দুই-তৃতীয়াংশ (১,৩০,২৭৯ ব:কিমি:)। এর জনবসতি সমগ্র যুক্তরাজ্যের ৮৩% (৫৪,৩১৬,৬০০জন ২০১৪ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী)। এই দেশের মোট জনসংখ্যার ৭৯.৮% ব্রিটিস, ২.৬% ভারতীয় ০.৮% বাংলাদেশী ২.১% পাকিস্তানী ১.৮% আফ্রিকান ৪.৬% শ্বেতাঙ্গ, এবং ১.১% ক্যারিবিয়ান। এই দেশের নাগরিকদের বলা হয় "ইংরেজ" এবং এদের জাতীয় ভাষা "ইংলিশ"।
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে পার্থক্য কি?
প্রথমে আমাদের জানা দরকার রাষ্ট্র এবং রাজ্যের মধ্যে পার্থক্য কি! "রাষ্ট্র" হলো এমন একটি অঞ্চল যা "অধিবাসীদের দ্বারা স্ব-শাসিত এবং যারা নিজেদেরকে সম্পূর্ণরূপে সনাক্ত করতে পারে। তারা কোনোরকম আলোচনায় তাদেরকে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য একজন একক ব্যক্তি/সত্তা কে চিহ্নিত করে না"। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হলো একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র যা ৫০টি রাজ্য দ্বারা গঠিত। ওয়াশিংটন ডি.সি.-তে ভিত্তিক ফেডারেল সরকারের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র একত্রিত। এই রাষ্ট্রের কোনও "রাজা" বা "রানী" নেই।

অপরদিকে "রাজ্য" হলো এমন একটি সাংবিধানিক সরকার যেখানে,"অধিবাসীরা তাদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য একজন রাজা অথবা রানীকে স্বীকৃতি দেয়। যারা কোনও নির্দিষ্ট পূর্বপুরুষের বংশ বা পরিবার থেকে থাকেন। তাঁরা আজীবনের জন্য মনোনীত হবেন ঠিকই, কিন্তু তাদের কাছে সম্পূর্ণ ক্ষমতা থাকতে পারবে না"। যুক্তরাজ্য বা ব্রিটেন  হলো চারটি দেশের ইউনিয়ন ,যথা:  ইংল্যান্ড, ওয়েলস, স্কটল্যান্ড এবং উত্তর আয়ারল্যান্ড। যুক্তরাজ্যের প্রথম তিনটি দেশ হল  ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড এবং ওয়েলস।  চতুর্থটি বা উত্তর আয়ারল্যান্ড হলো আয়ারল্যান্ড দ্বীপের একটি অংশ। আয়ারল্যান্ডের বাকি অংশটি আলাদা একটি দেশ, যা আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্র নামে পরিচিত তবে  এটি যুক্তরাজ্যের অংশ নয়। এই চারটি দেশ ব্রিটিশ একক রাজ্য হিসাবে একীভূত হয়, এবং তৎকালীন ব্রিটিশ রাজা বা রানীকে সেখানকার সরকারী প্রধান হিসেবে মানা হয়। রাজা বা রানী অধীনে একসময় থাকার কারনে ইংল্যান্ডকে যুক্তরাজ্য বলা হয় ।

ইংল্যান্ডের রাজপরিবারের ইতিহাস:
একসময় পুরো ব্রিটেন সহ পৃথিবীর প্রায় বেশীর ভাগ দেশ ইংলিশদের অধীনে থাকলেও বর্তমানে তা বিলুপ্ত প্রায়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রাজা এবং রাজপরিবার সম্পূর্ণ ভাবে বিলুপ্ত হয়ে গেলেও ব্রিটিস রাজপরিবার এদিক থেকে বেশ আলাদা। ইংল্যান্ড এর রানী "দ্বিতীয় এলিজাবেথ" কে এখনো বিশ্বে সম্মান করা হয়। এমনকি রাজপরিবারের সদস্যদেরও যথেষ্ট সম্মান ও শ্রদ্ধা করা হয়।

ইংল্যান্ড, যা একসময় রোমান সাম্রাজ্যের অন্তুর্ভুক্ত ছিল। ভূখণ্ডটি যে সবার কাছে একেবারেই  অজ্ঞাত ছিল সকলের কাছে, তা কিন্তু  নয়। তবে দেশটিতে সব ধরনের সাধারন মানুষের  যাওয়া-আসার সুযোগ তখনও হয়ে ওঠেনি। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের শুরুর দিকে গ্রিক, ফিনিশিয়ান ও কার্থেজিয়ানরা ইংল্যান্ডের সাথে তাদের  বাণিজ্য পরিচালনা করত। তবে গ্রিকরা এই ইংল্যান্ডকে একটি ক্ষুদ্র এক দ্বীপ হিসেবেই উল্লেখ করেছে, যা ইউরোপের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত।

এই দ্বীপে প্রথম আগমন নিয়ে দুটি দাবি বেশ জনপ্রিয়। বিভিন্ন ইতিহাসবিদদের ধারনা, খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে "হিমিলকো" নামক এক কার্থেজিয়ান নাবিক এই দ্বীপে প্রথম আগমন করেন। অন্যদিকে গ্রিকরা দাবি করে থাকে যে, গ্রীক পরিব্রাজক পাইথিয়াস খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে সর্বপ্রথম এই দ্বীপে আসেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো,  অধিকাংশ ইতিহাসবেত্তাই  গ্রিক ও কার্থেজিয়ানদের এই  দাবিকে সম্পূর্ণ ভাবে অগ্রাহ্য করেছেন।

বেশীরভাগ ইতিহাসবিদদের মতে,  ইংল্যান্ড সর্বপ্রথম আবিষ্কৃত হয়েছিল জুলিয়াস সিজারের সময়কালে খ্রিস্টপূর্ব ৫৫ এবং ৫৪ সালের দিকে তিনি দুইবার অভিযান চালান কিন্তু প্রতিবারই তাকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যেতে হলেছিল এবং পাশাপাশি ব্যাপক সৈন্যও হারাতে হয়েছিল। পরবর্তীতে রোমান যোদ্ধা আউলাস প্লাওটিয়াস খ্রিস্টাব্দ ৪৩ সালের দিকে ইংল্যান্ড জয় করেন এবং তার হাত ধরেই ইংল্যান্ড রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।

৪১০ খ্রিস্টাব্দের দিকে ইংল্যান্ডে রোমান সাম্রাজ্যের পতন হয়। রোমান সাম্রাজ্যের পতনের মধ্য দিয়েই ইংল্যান্ড এ  রাজতন্ত্রের ভিত গড়ে ওঠে। যার নেতৃত্ব দিয়েছিলো অ্যাংলো-স্যাক্সনরা। তারা ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই 'হেপ্টারকি' নামক এক নতুন শাসন ব্যবস্থার প্রচলন করা হয়। এই শাসনকালেই ইংল্যান্ডকে সাতটি স্বাধীন রাষ্ট্রে বিভক্ত করা হয়। এগুলো হলো: কিংডম অব নর্থামব্রিয়া, ওয়েসেক্স, মার্সিয়া, ইস্ট-অ্যাংলিয়া, এসেক্স, কেন্ট এবং সাসেক্স। এই হেপ্টারকি শাসনব্যবস্থা প্রায় ৪০০বছর চালু ছিল। 

এই সময়ে স্বাধীন সাতটি  রাজ্যের রাজা পর্যায়ক্রমে দেশটিকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন । ওয়েসেক্সের রাজা এগবার্ট ছিলেন ঐ সাত রাজার মধ্যে সবচেয়ে বেশী শক্তিশালী ও ক্ষমতাধর। তিনি ওয়েসেক্স ছাড়াও কেন্ট, সাসেক্স ও সারে রাজ্যগুলো ও  নিয়ন্ত্রণ করতেন। তবে এই শাসন ব্যবস্থা ও বেশী দিন টেকেনি।১০৬৬ সালে হেপ্টারকি ব্যবস্থার অবসান ঘটে। 
হেপ্টারকি শাসনের অবসানের পর উইলিয়াম দ্য কনকারার নিজেকে পুরো ইংল্যান্ডের একক রাজা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি ই ছিলেন ইংল্যান্ডের প্রথম রাজা। তার হাত ধরেই ইংল্যান্ডে রাজ শাসন শুরু হয়। ৯২৭ সালে তাকে ইংল্যান্ডের প্রথম রাজা হিসেবে অন্য রাজারা মেনে নিয়েছিলেন। তার শাসনকাল ছিল  ইংল্যান্ডের রাজনীতি ও ইতিহাসের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একঁই সময়। একসময় পুরো বিশ্ব যে  ব্রিটিশরা দখল করেছিল তার বীজ বপন করেছিলেন তিনি। এর থেকে আমরা সহজেই বুঝতে পারি

ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ভিত্তি রাজা "উইলিয়াম দ্য কনকারা" করলেও এই  রচনার শেষ কাজটুকু করেন নরম্যানরা। ১০৬৬ সালে নরম্যানরা ইংল্যান্ড-জয় করলে "উইলিয়াম দ্য কনকারা" নিজেকে ইংল্যান্ডের একক রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ইংল্যান্ড বিজয়ের পর তিনি একে একে সাতটি রাজ্য নিজের নিয়ন্ত্রণে আনেন, যা এখনো ইউনাইটেড কিংডম (United kingdom, UK)  বা যুক্তরাজ্যের অন্তর্ভুক্ত।

প্রায় ১০০ বছর শাসনের পর "উইলিয়াম দ্য কনকারার" শাসনকাল অধ্যায়ের অবসান ঘটে। এরপর  ইংল্যান্ডের ক্ষমতায় আসে টুডররা। "টুডরের" সময়ে সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে ইংল্যান্ড, ওয়েলস এবং আয়ারল্যান্ডকে নিয়ে। এরপরই ইংল্যান্ডের রাজতন্ত্রে অরাজকতা দেখা দেয়। বিভিন্ন রাজ্যের রাজাদের মধ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধিপতি হওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয় আর এই প্রতিযোগিতা থেকেই স্কটল্যান্ডের রাজা "প্রথম জেমস" ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজা হন। একে ষষ্ঠ জেমস নামেও অবিহিত করা হয়। 

১৭১৩ সালের পর  ব্রিটিশ সাম্রাজ্য হ্যানোভারিয়ানদের অধীনে চলে যায়।হ্যানোভারিয়ানদের পাঁচ প্রজন্ম পর জন্ম হয় রানী ভিক্টোরিয়ার। তিনি ছিলেন স্যাক্সে কোবার্গ রাজপরিবারের প্রিন্সেস ভিক্টোরিয়া এবং ডিউক অব কেন্ট এডওয়ার্ডের মেয়ে। রানী ভিক্টোরিয়া মাত্র ১৮বছর বয়সে সিংহাসনে আরোহন করেন এবং তার পরবর্তী বংশধররাই বর্তমান রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ।

নবীনতর পূর্বতন