স্নিগ্ধা দুপুর বেলা হালকা ঘুমানোর চেষ্টা করছে।যেটাকে বলে ভাতঘুম  আরকি।ঠিক তখনই স্নিগ্ধা কলিং বেলের শব্দ শুনতে পেল।স্নিগ্ধার মুখে একরাশ বিরক্তির ছাপ এই অসময়ে আবার কে আসল।সোহান(স্নিগ্ধার হাজবেন্ড) তো অফিসে আর ও তো দুপুরে কোনদিন বাসায় আসেনা তাহলে আজকে এই অসময়ে কে আবার এলো।বিরক্তি ছাপিয়ে এবার স্নিগ্ধার চেহারায়  ফুটে উঠল ভয়ের ছাপ।এর কারণ স্নিগ্ধা বাসায় একা থাকে।এবং এই অসময়ে বাসায় কেউই আসেনা।আর যদি কোন কেউ এসে থাকে তাহলে আসার পূর্বে দারোয়ান ফোন দেয়।কিন্তু আজকে কেউ ফোন দেয়নি।ভয় এবং বিরক্তি মিশ্রিত চেহারা নিয়ে দরজার সামনে গেল স্নিগ্ধা।এরপর দরজার ভিতরের গ্লাস দিয়ে দেখার চেস্টা করল কে এসেছে।স্নিগ্ধা দেখল দরজার সামনে লাল টিশার্ট পড়া একটা লোক দাড়িয়ে আছে।ভয়ে ভয়ে দরজা খুলল সে!
দরজা খুলতেই লোকটি বলে উঠল ম্যাম আপনার নামে একটি পার্সেল আছে।

স্নিগ্ধার ভয়টা এবার আস্তে আস্তে কেটে যেতে লাগল এবার সে অবাক হয়েই বলল জ্বি!

ম্যাম আপনার নামে একটি পার্সেল আছে।আপনি কাইন্ডলি এইখানে একটি সই করে পার্সেলটি গ্রহন করুন। লোকটি আবারও বলল!

স্নিগ্ধা এইবার লোকটাকে বলল আপনি মনে হয় ভুল ঠিকানায় এসেছেন।আমার নামে তো কোন পার্সেল আসার কথা নয়।

ম্যাম পার্সেল এ তো এই ঠিকানাই দেওয়া আছে রোড নং ১৫ আর বাসা নং ১৪ এর তৃতীয় তলার ফ্ল্যাট 3-B.

স্নিগ্ধা চিন্তা করে দেখল না বাসার ঠিকানা তো ঠিকই দেওয়া আছে কিন্তু ওকে কে পার্সেল পাঠালো।সে আবার লোকটাকে জিজ্ঞেস করল আচ্ছা পার্সেলটা কোথা থেকে এসেছে আপনি কি বলতে পারবেন?

লোকটি বললো সরি ম্যাম আমি তো এটা বলতে পারবো না।আপনি কাইন্ডলি সাইনটা করুন এবং পার্সেলটি নিন।

স্নিগ্ধা আর কথা না বাড়িয়ে সাইন করে আর পার্সেলটি গ্রহন করে।

লোকটি স্নিগ্ধা কে ধন্যবাদ দিয়ে চলে যায়।

স্নিগ্ধা দরজা বন্ধ করে পার্সেলটি হাতে নিয়ে ভাবছে কে তাকে পার্সেলটি পাঠাতে পারে!আর পার্সেলের উপরে তো কোথাও কোন ঠিকানা বা পরিচয় ও দেওয়া নাই।

সে ভাবলো তাহলে কি সোহান তাকে সারপ্রাইজ দিবে বলে পার্সেলটি তাকে না বলে পাঠিয়েছে।হতে পারে আবার নাও হতে পারে।এইসব ভাবতে ভাবতেই সে বেডরুমের দিকে চলে গেল।বেডরুমে গিয়ে সে পার্সেলটি খোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে আর তার মধ্যে একটা কৌতুহল ও কাজ করছে কি আছে এর মাঝে ওজন তো খুব একটা অনুভুত হচ্ছে না।

স্নিগ্ধা এবার পার্সেলটি খুললো। আর সে অবাক হয়ে দেখল পার্সেলের ভিতর একটি ফুলের তোড়া আর একটি কাগজের টুকরো এবং তাতে কিছু লেখা ছিল।

সে কৌতুহলী হয়ে কাগজের টুকরো টি খুললো আর তাতে গোটা গোটা করে লেখা ছিল-
 "কেউ আপনাকে ধোঁকা দিচ্ছে কিন্তু আপনি কিছুই বুঝতে পারছেন না।আপনি যদি স্বচোক্ষে দেখতে চান তাহলে আজকে বিকেল পাঁচটার সময় ধানমন্ডির বার্গার কিংয়ে চলে আসবেন "

ইতি আপনার একজন শুভাকাঙ্ক্ষী!

এই লেখাটির আগামাথা কিছুই বুঝতে পারলো না সে! আর কেই বা পাঠিয়েছে এটি।এই পার্সেলটি পাওয়ার পর থেকেই স্নিগ্ধার মাথায় নানা ধরনের চিন্তা গিজগিজ করছে। আর কেই বা তার শুভাকাঙ্ক্ষী আর তাকে বিকেল পাঁচটায় তাকে কেন বার্গার কিং য়ে যেতে বলছে।আর কেউ তাকে ধোঁকা দিচ্ছে নাতো? আর কাওকে খুজেও পাচ্ছে না যে এমন মজা করতে পারে।তাহলে কে হতে পারে এটা?

এইখানে সে তার হাজবেন্ড সোহান এর সাথে।সোহানের সাথে তার বিয়ে হয়েছে প্রায় দেড় বছর হয়েছে।তারা একে অপরকে খুব ভালবাসে যাকে বলে হ্যাপিয়েস্ট কাপল।সোহান তাকে ধোঁকা দিবে এইটা স্নিগ্ধা কল্পনাতেও ভাবতে পারেনা।তাহলে এই সমস্ত কথার মানে কি?

আর ভাবতে পারছেনা স্নিগ্ধা তার মাথাটা যেন  আর কাজ করছে না।সেই দুপুরে সে আর ঘুমাতে পারল না।মাথায় বিভিন্ন ধরনের চিন্তা কাজ করছে।কিন্তু সে আবার ওই পার্সেলটার কথাও মাথা থেকে নামাতে পারছেনা।কে পাঠালো পার্সেল টা।সে একবার ভাবল সোহানকে ফোন দিয়ে সবটা খুলে বলি।কিন্তু কিছু একটা মনে করে আর বললো না।তবে স্নিগ্ধা আবার একটু কৌতুহল প্রিয় মানুষ।তাই সে তার নিজের কৌতুহল দমন করতে না পেরে বিকেল সাড়ে পাচটায় ধানমন্ডির বার্গার কিং এ উপস্থিত হয়।
সে গিয়ে বসল আর খাবার অর্ডার করল।কিন্তু আসে পাশে নজর রাখছে যে কেউ তাকে ফলো করছে কিনা তা খেয়াল করার চেষ্টা করলো কিন্তু না সন্দেহজনক কোন কিছুই তার চোখে পরলো না।সে ওইখানে সারে পাঁচটা থেকে সাতটা বিশ পর্যন্ত অপেক্ষা করল।কিন্তু না যে তাকে পার্সেলটি পাঠিয়েছে তার কোন খবর নেই।এবার সে বিরক্ত হয়ে বাসায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।এমন সময় তার ফোনে একটি এসএমএস এসল।কিন্তু এসএমএসটিতে কোন নাম্বার শো করছিল না প্রাইভেট নাম্বার। সে এসএমএসটি ওপেন করল আর তাতে লেখা ছিল "থ্যাংকস ফর কামিং" এবার সে হন্তদন্ত হয়ে চারদিকে তাকায় তারমানে সে আশেপাশেই আছে এবং সে তাকে দেখছে।কিন্তু স্নিগ্ধা কাউকে খুঁজে পায় না।

ওইদিন স্নিগ্ধা মন মেজাজ খারাপ করেই রেস্টুরেন্ট থেকে বাসায় ফিরে আসল। আর ভাবতে থাকে তার সাথে এই ধরনের মজা করার মানে কি?কেই বা করছে এসব?

সে বাসায় ফিরে দেখে সোহান বাসায় ফিরেছে।

সোহানঃ স্নিগ্ধা কোথায় গিয়েছিলে?

স্নিগ্ধাঃ এই একটু শপিংয়ে গিয়েছিলাম।(মিথ্যে বলল কারণ সত্যিটা বললে স্নিগ্ধা তাকে না বলে অপরিচিত কারো সাথে দেখা করতো গিয়েছে তাহলে রাগ করতে পারে আর তার ঠিকানায় কে পার্সেল পাঠিয়েছে এইটা নিয়ে চিন্তা ও করতে পারে বলে লুকিয়ে গেল)

সোহানঃ ও আচ্ছা তুমি শপিংয়ে গিয়েছিলে তাহলে শপিং কোথায়।আর তুমি শপিংয়ে যাবে আমাকে বলবেনা আমার দশটা না পাঁচটানা একটা মাত্র বউ।আমি নিজে গিয়ে বউয়ের শপিং করে দিতাম বলেই সোহান পেছন থেকে স্নিগ্ধা কে জড়িয়ে ধরে।

স্নিগ্ধাঃ এহ হয়েছে আর আদিক্ষেতা দেখাতে হবে না!এখন যেন বউয়ের জন্য দরদ একেবারে উতলে উঠেছে বলেই একটা মিস্টি হাঁসি দেয় সে।

সোহানঃ ওহ তোমার এই হাঁসিটা আমাকে বার বার খুন করে ফেলে! কিন্তু তাতেও আমার কোন কষ্ট নেই কারণ তোমার এই হাঁসিতে আমি বারংবার খুন হতে চাই।

স্নিগ্ধাঃ হয়েছে হয়েছে এখন আর প্রেম দেখাতে হবে না।তাহলে রাতে প্রেমের হাওয়া খেয়েই থাকতে হবে বুজলে ভাত আর খাওয়া লাগবে না।তুমি আমাকে ছাড়ো আমি এখন নাস্তা রেডি করব।

বলেই স্নিগ্ধা নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় আর সোহান জোড়ে জোড়ে হাঁসতে থাকে।
পরের দিন আবার ঠিক একই টাইমে অর্থাৎ দুপুরে।কলিং বেলের আওয়াজ আসল স্নিগ্ধার কানে।

যথারীতি আবার আজকে সে দরজা খুলে অবাক হয় আজকেও সেই কুরিয়ারের লোক আসছে কিন্তু আজকে অন্যজন। স্নিগ্ধা পোশাক দেখেই চিনতে পেরেছে এইটা কুরিয়ারের লোক।

লোকটি বলল ম্যাম আপনার নামে একটি পার্সেল আছে কাইন্ডলি এইখানে সাইন করুন।

স্নিগ্ধার আজকে রাগ হল কারণ তারসাথে এইধরনের মজার মানে কি আর কেইবা তার সাথে দুস্টুমি করছে।

স্নিগ্ধা কুরিয়ারের লোকটার সাথে কথা না বাড়িয়ে সাইন করে দিয় পার্সেলটি গ্রহন করে তাকে বিদায় করল।

আজকে সে বিরক্তি নিয়ে পার্সেলটি খোলে আবারও সেই একটি ফুলের তোড়া এবং একটি কাগজ।স্নিগ্ধা বিরক্তি নিয়েই কাগজ টি খুলল কালকের মত গোটা গোটা করে লেখা ছিল,
 "কালকের ঘটনার জন্য দুঃখিত কিন্তু বিশ্বাস করুন আমি আপনার ভাল চাই। আপনার সাথে কেউ অনেক বড় ধোঁকাবাজি করছে কিন্তু আপনি বুঝতে পারছেন না। আপনি আজকে আবারও কালকের ঠিকানাতে আসবেন বিকেল পাঁচটার সময়।
ইতি আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী।"

কিন্তু ওইদিন স্নিগ্ধা যায় নি কারণ স্নিগ্ধার মেজাজ খারাপ হয়ে গিয়েছিল প্রথম দিন কেউ একজন তাকে ধোঁকা দিয়ে মজা নিয়েছিল আজকেও হয়ত নিবে তাই সে আন যায়নি।

কিন্তু পরেরদিন যথারীতি আবার স্নিগ্ধার নামে একটি কুরিয়ার আসে।এইবার স্নিগ্ধার ভয় হতে লাগল যে, কে তারসাথে এমন করছে তাই আজকে সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সোহান বাসায় আসলে আজকে সোহানকে পুরো বিষয় খুলে বলবে।আজকে কুরিয়ার খুলে স্নিগ্ধা খুবই অবাক হল আজকে ফুলের পরিবর্তে স্নিগ্ধার সবচেয়ে প্রিয় চকোলেট দিয়েছে সাথে যথারীতি একটি চিরকুট।

কিন্তু স্নিগ্ধা ভাবছে এই চকোলেট যে তার খুব পছন্দের এইটা তো তার কয়েকজন ঘনিষ্ট বন্ধু আর সোহান ছাড়া কেউ জানে না। তাহলে ওদের মধ্য থেকে কেউ একজন কি স্নিগ্ধার সাথে মজা করছে।স্নিগ্ধা চিরকুট টি খুলল তাতে আজকে খুবই অদ্ভুত একটি লিখা,
" বিশ্বাস যেমন মানুষের জীবনকে সুন্দর করে তোলে তেমনি অন্ধ বিশ্বাস কিন্তু মানুষের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।এবং তারপর লিখা আজ বিকেল পাঁচটায় আবারো বার্গার কিংয়ে আসবেন।"

ইতি আপনার একজন শুভাকাঙ্ক্ষী।

স্নিগ্ধার মনে হয় একটি গোলক ধাঁধায় সে হারিয়ে গিয়েছে,আর সে সমস্ত জায়গা দিয়ে ঘুরছে কিন্তু কোন কুল কিনারা খুঁজে পাচ্ছে না!

তবে তার শুভাকাঙ্ক্ষীর কথামতো আজকে আবারো সে রেস্টুরেন্ট যায়।কারণ তার যে  এই গোলক ধাঁধার সমাধান করতেই হবে।আর তাকে জানতে হবে কে তার শুভাকাঙ্ক্ষী।আর কি সত্যই বা তাকে সে জানাতে চায়।আজকে সে বার্গার কিংয়ের একটি কিনারার সিটে গিয়ে বসল।আর খাবার অর্ডার করে খাচ্ছে।কিন্তু তার চেয়েও চিন্তা করছে বেশি।

কিন্তু হঠাৎ করেই তার চোখ আটকে যায়! এটা সে কি দেখছে নিজের চোখকেই আজকে স্নিগ্ধার কাছে অবিশ্বাস লাগছে।সে চোখটা ভাল করে পরিস্কার করে আবারো তাকায় কিন্তু একই জিনিস দেখতে পারছে।

সে যা দেখলো এটি দেখার জন্য সে একদমই প্রস্তুত ছিলনা!তার মাথায় যে আকাশ ভেঙ্গে পড়ল।সে কি করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলো না!তাহলে কি তার এতোদিনে সকল ভাবনাই ভুল ছিল।সে সব কিছু স্বচক্ষে দেখার পরেও জানি বিশ্বাস করতে পারছে না!তার সব বিশ্বাস আশা ভরসা সব যে আজ মিথ্যা হতে বসেছে!

সে দেখলো অপর পাশের একটি টেবিলে তার প্রান প্রিয় স্বামি তার ভালবাসা সোহান একটি মেয়ের হাত ধরে বসে আছে।আর খুবই হাসি খুশি ভাবে কথা বলছে!

স্নিগ্ধা কি করবে কিছুই বুঝতে পারছেনা!সে সেখানে চুপ করে করে রইল।আর নিরবে সকল কিছু দেখে বাড়ি ফিরে এল।আসার পথে মনে হলো দুনিয়াদারি সকল কিছুই যেন অন্ধকার হয়ে আসছে।সে চোখে যে কিছুই ঠিক ঠাক দেখতে পারছেনা।
সে বাসায় ফিরে এসে সোফায় বসে পরল।যেন তার আজ কোন কিছুই ভাল লাগছেনা।জিবনের কোলাহল যেন তার মনে কোনই প্রভাব বিস্তার করতে পারছে না।সে জানালার পাশে গিয়ে বসে আকাশের পানে তাকিয়ে রয়েছে এক দৃস্টিতে।কোন কিছুই যেন তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারছে না।

এদিকে রাত ঘনিয়ে আসছে,পুরো ঘড় অন্ধকার যেন আলো জ্বালতেই ভুলে গিয়েছে স্নিগ্ধা।তার মনে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।সে আজ যা দেখলো তা কি আসলে সত্য নাকি সে স্বপ্ন দেখেছিল!

কারন সোহান আর স্নিগ্ধার মাঝে যে পরিমান ভালবাসা তাতে সোহান এমনটা করতে পারে এটা কল্পানারও  বাইরে।

রাত ১০ টায় সোহান বাসায় ফিরল।কিন্তু সোহানে মুখে কোন অপরাধ বোধ বা কিছুর দেখাই দেখতে পেল না স্নিগ্ধা!আর প্রতিদিনের মতই আচারন করলো সোহান। স্নিগ্ধাও সোহান কে কিছু বুঝতেও দিলনা।

স্নিগ্ধাও তাকে কিছুই বললো না।কারন সে আর কিছু বলার মত মানসিক অবস্থায় ছিল না।তার রিদয় যে আজ সোহান ভেঙ্গেচুরে চুরমার করে দিয়েছে!

স্নিগ্ধা শুধু এটাই ভাবছিল সোহানের মুখের দিকে তাকিয়ে,
"পৃথিবীর সকল ভালবাসার মানুষই কি প্রিয়জনের কাছে এক আর বাইরে ভিন্ন হয়?তাহলে কি সকল ভালবাসা বলতেই অভিনয়!"

-তিমন কুমার দে

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন