ভূমিকা : সংস্কৃতে একটি কথা আছে-
“জননী জন্ম ভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরিয়সী।”
অর্থাৎ জননী ও জন্মভূমি স্বর্গ থেকেও শ্রেষ্ঠ। সত্যই তাই কারণ, পিতামাতার চেয়ে এ দুনিয়ায় শ্রেষ্ঠ কেউ নয়। হাদিস শরীফে বলা হয়েছে, “মাতার পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। কেননা,ভূমিষ্ঠ হবার পর থেকেই পিতামাতা সন্তানের জন্য দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেন, ত্যাগ স্বীকার করেন। তাদের স্নেহে সন্তানরা বড় হয়, মানুষ হয়। তাই এ বিশ্বসংসারে পিতামাতার মতাে আপনজন আর কেউই নয়। পবিত্র কোরআন শরীফে বর্ণিত আছে, 
“প্রথমে আল্লাহর প্রতি কর্তব্য সম্পাদন করতে হবে; তারপর কর্তব্য সম্পাদন করতে হবে মাতা-পিতার প্রতি।

হিন্দু শাস্ত্রে আছে,

“পিতা স্বর্গ পিতা ধর্ম, পিতা পরমতপঃ।"

এছাড়া বিখ্যাত মনীষী ও সপ্রসিদ্ধ লেখক রাস্কিন বলেছেন,“ পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষের তিনটি কর্তব্য রয়েছে-
ক) আমাদের সৃষ্টিকর্তার প্রতি কর্তব্য
খ) আমাদের পিতামাতার প্রতি কর্তব্য
গ) মানবজাতির প্রতি কর্তব্য।”
পিতামাতার ঋণ কোনাে সন্তান শােধ করতে পারে না। পিতামাতার ঋণের পরিমাণ লিখে বা বলে শেষ করা যায় না তাদের ঋণ অপরিশােধ্য।
বাংলা রচনাসমগ্র
সন্তানের জন্য পিতামাতার শ্রম : পিতামাতার কাছে আমরা বিভিন্নভাবে ঋণী। মাতা আমাদের জন্য দশ মাস দশ দিন সীমাহীন কষ্ট যন্ত্রণা ভােগ করেন। মাতা আমাদের গর্ভে ধারণ করে যে কষ্ট সহ্য করেন তার ঋণ আমরা কখনাে শােধ করতে পারব না। জগৎ যাকে দূরে ঠেলে দেয়, মাতা তাকে পরম আগ্রহে বুকে টেনে নেয়। 'মা' ডাকের মতাে এত মধুর আর সুন্দর ডাক পৃথিবীতে নেই। এ ডাক শুনলে আমাদের অন্তরের সব বেদনা দূরীভূত হয়। তাই কবি বলেছেন,

“মা কথাটি বড় মধুর সুধার সমান
কহিলে শুনিতে সদা জুড়ায় পরান
যেখানে থাকি দেশ-দেশান্তরে
 মা বলে ডাকিলে সব দুঃখ যায় দূরে।”

মা কথাটি যতই মনে হয় ততই মধুর লাগে। পিতামাতার মনে কষ্ট দেওয়া মহাপাপ। পিতা আমাদের পরম গুর। তিনি সন্তানের খাদ্য ও পােশাক এবং অন্যান্য প্রয়ােজনীয় দ্রব্যাদি অনেক কষ্ট করে যােগাড় করেন। সন্তানের সুশিক্ষা প্রদানে তার চেষ্টার কোনাে শেষ নেই।
পিতামাতা চান সন্তান ভালাে হােক; চরিত্রবান, স্বাস্থ্যবান ও বিদ্বান হােক। সুতরাং প্রতিটি সন্তানের উচিত এসব গুণের অধিকারী হয়ে পিতা মাতার মনের আশা পূর্ণ করা। আমাদের সামান্য অসুখ হলে পিতামাতা আহার-নিদ্রা ভুলে সন্তানের সেবা করেন। তারা আমাদের ভবিষ্যৎ জীবনের প্রতি পদক্ষেপের পাথেয়। তারাই আমাদের জীবনে আদর্শ ও পথ চলার সাথী।

পিতা মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য : এ বিশ্বে আমাদের কর্তব্যের শেষ নেই। তন্মধ্যে প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হচ্ছে পিতামাতার প্রতি। ছাত্রজীবনে সন্তানের কর্তব্য পিতা মাতার আদেশ পালন করা। পিতামাতার আদেশ পালনের মাধ্যমেই সন্তান সঠিক পথে চলতে পারে,সন্তান যেমনই হোক না কেন পিতামাতা সর্বদাই সতানের মাঙ্গলাকাঙ্খী। যে ছাত্রজীবনে পিতামাতার আদেশ পালন করে না সে কখনাে উন্নতি লাভ করতে পারে না। কর্মজীবনে সন্তানের উচিত পিতামাতার সেবাযত্ন করা এবং বৃদ্ধকালে অক্ষম হয়ে পড়লে তাদের দায়িত্ব গ্রহণ করা। হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে, “যে সন্তান বৃদ্ধ অবস্থায় পিতামাতাকে পেয়েও বেহেশত কিনে নেয়নি অর্থাৎ তাদের সেবা যত্ন থেকে বিরত থেকে ছিল এর চেয়ে হতভাগা কেউ নেই। আমাদের মনে রাখা উচিত, শিশুকালে পিতামাতা আমাদের বড় করে তােলার জন্য, মানুষের মতাে মানুষ করার জন্য যে ত্যাগ করেছেন, সেই ঋণ আমরা কখনাে শােধ করতে পারব না।আধুনিক যুগে দেখা যায় যে, অশিক্ষিত পিতা মাতাকে অনেকে ঘৃণার চোখে দেখে এবং তাদের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করে এমন কুপুত্রের সংখ্যা অনেক। এ সন্তানরা অবশ্যই ইহকাল ও পরকাল হারাবে। তারা জীবনে সুখী হতে পারে না বা পারবে না। জীবনে সুখী হওয়ার জন্য।প্রত্যেক সন্তানের উচিত সৃষ্টিকর্তার কাছে পিতামাতার জন্য দোয়া-আশীর্বাদ প্রার্থনা করা।

মনীষীদের পিতামাতার প্রতি কর্তব্যের উদাহরণ : পৃথিবীতে যারা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন এবং মহাপুরুষের খ্যাতি অর্জন করেছেন তারা প্রায় সবাই অবিচল নিষ্ঠার সাথে কাজ করেছেন। আলেকজান্ডার বলেছেন,

“আমার মায়ের এক বিন্দু অশ্রু আমার শতপংক্তি মুছে দিতে পারে।”

এছাড়া বায়েজীদ বােস্তামীর মাতৃভক্তির দৃষ্টান্ত অতুলনীয়। আবার নেপােলিয়ন, স্যার সৈয়দ আহমদ খান প্রমুখ মনীষীরও পিতামাতার প্রতি শ্রদ্ধা ও কর্তব্য ছিল অতুলনীয়। তাদেরকে অনুসরণ করে আমরা পিতামাতার প্রতি শ্রদ্ধা, ভক্তি ও কর্তব্য সম্পাদন করতে সক্ষম হব।

উপসংহার : সব পিতামাতার আকাঙ্ক্ষা এই যে, সন্তানরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হােক, দেশ-বিদেশে তাদের খ্যাতিতে পিতামাতার মুখ উজ্জ্বল হােক।স্বনামধন্য পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কথা কে না জানে। পিতামাতার প্রতি তার অঢেল ভক্তির কথা আজ আমাদের মুখে মুখে ফিরছে। যে সন্তান পিতামাতার সন্তুষ্টি বিধান করে তার জীবন সার্থক। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত আছে,

“পিতামাতার আদেশ-নির্দেশ পালন কর; তারা অক্ষম হয়ে পড়লে তাদের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ কর না, সব সময় তাদের জন্য প্রার্থনা কর।”

প্রকৃতপক্ষে, পিতামাতা না হলে এ সুন্দর ভুবনের আলােবাতাস দেখা যেত না; এ ভুবনে আগমন করাই অসম্ভব হতাে। সুতরাং পিতামাতার অনুগত ও বাধ্য হওয়া সন্তানের অবশ্য কর্তব্য। পিতামাতার চেয়ে আপন জন কেউ নেই। তাই বলা চলে-
“পিতৃ মাতৃ ধন এ বিশ্বে বেশি আপন।”

❤একটি মন্তব্য লিখুন❤

💥পোস্টটি কেমন লাগলো?
💥এ সম্পর্কে কোন প্রশ্ন বা কোন মতামত আছে?
💥মতামত বা প্রশ্ন থাকলে তা কমেন্ট করে আমাদের জানান!

নবীনতর পূর্বতন