রচনা: বই পড়ার আনন্দ
অথবা, পুস্তক পাঠের আনন্দ
অথবা, রচনা বই পড়ার আনন্দ
অথবা, অনুচ্ছেদ রচনা বই পড়ার আনন্দ
অথবা, বই পড়ার আনন্দ অনুচ্ছেদ রচনা
অথবা, বই পড়ার আনন্দ প্রবন্ধ রচনা
অথবা, বাংলা রচনা বই পড়ার আনন্দ

(সংকেত: সূচনা-বই মানুষের সঙ্গী- বই পাঠের প্রয়ােজনীয়তা- বই পাঠের আনন্দ - উল্লেখযােগ্য বই- উপসংহার)
বই পড়ার আনন্দ

ভূমিকা : প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই মানুষকে আমরা দেখে আসছি যৌথ জীবনের পটভূমিকায়। যখন সভ্যতার আলাে মানব সংসারে বিকীর্ণ হয়নি, মানুষ যাপন করেছে অরণ্যচারী ভ্রাম্যমাণ জীবন, তখনও সে চেয়েছে তারই মতাে অপর এক মানুষের সঙ্গ। মানুষের গড়া এ যে সমাজ, তার মূলেও রয়েছে উক্ত সহজাত যৌথ বৃত্তির প্রেরণা। আর এ জন্যই মানুষ বন্ধু হিসেবে বেছে নিয়েছে বইকে। আনন্দের আরেক নাম বই। কর্মক্লান্ত মানুষের একটুখানি অবসর হচ্ছে বই। তাই মহান ঔপন্যাসিক লিও টলস্টয়ের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে, Three things are essential for life, and these are-Books, books, and books. রবিন্দ্রনাথ বইকে দেখেছেন অতীত এবং ভবিষ্যতের মধ্যকার সাঁকো  হিসেবে। আর প্রখ্যাত চিন্তাবিদ Gibbon বলেছেন, 'Books are those faithful mirrors that reflect our mind, the mind of sages and heroes.

বই মানুষের সঙ্গী : মানুষের জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য সাধনার নির্বাক সাক্ষীরূপে দাঁড়িয়ে রয়েছে জগতের মহামূল্য গ্রন্থরাজি। এগুলাের ভেতর দিয়েই তারা লাভ করে থাকে আপন অন্তরতম সত্তার পরিচয়। নির্জন অরণ্যে তুমি যাও-কোনাে মানব তােমার সাথী হবে না সেই অরণ্য প্রদেশে। কিন্তু তােমার নিঃসঙ্গতা মুছে দেবে একটি বই। অকূল সমুদ্রের জনশূন্য দ্বীপে হলাে তােমার বারাে বছরের জন্য নির্বাসন, সেখানেও মানুষের মুখ দেখতে পাবে না তুমি সুদীর্ঘ একটি যুগ ধরে। কিন্তু তাতেও তােমার চিত্তে কোনাে গ্লানি কিংবা দুঃখ নেই, যদি সাথে থাকে বইয়ের একটি শেলফ। যদি হৃদয়ের গভীরে বিচিত্র অনুভূতির প্রকাশ চাও, তবে তােমার চাই বিশিষ্ট মানুষের লেখা বিশিষ্ট কয়েকখানা বই। নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, শেকসপিয়র, ওয়ার্ডসওয়ার্থ কিংবা শেলির লেখা গ্রন্থ এক্ষেত্রে উল্লেখযােগ্য। মূলত বিশ্বকে উপলব্ধি করতে হলে বইয়ের নিবিড় সঙ্গ ছাড়া মানুষের চলে না।

বই পাঠের প্রয়ােজনীয়তা : মানুষের নিরন্তর সঙ্গ আমরা কামনা করি এজন্য যে, মানুষ মানুষের প্রয়ােজন মেটায়, পরস্পরকে আনন্দ দেয়।* একই কারণে বইয়ের সঙ্গও আমাদের কাম্য, সেও দেয় আনন্দ, আর মেটায় নানা প্রয়ােজন। আমাদের হৃদয়ানন্দে সৃষ্টি হয়েছে শিল্পকথা ও সাহিত্য, প্রয়ােজনবােধে সৃষ্টি হয়েছে বিজ্ঞান। আর পরাজ্ঞান ও জগতরহস্যের উৎস সন্ধানের ফলে আমরা পেয়েছি প্রাচী ও প্রতীচীর দর্শন।  কিন্ত আজকের দিনে আমরা পাবাে না হােমার, ভার্জিল, দান্তে, ট্যাসাে, শেকসপিয়র, নজরুল, রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎ। কোথায় পাব। মাদাম কুরী, ফ্যারাডে, মার্কনি, এডিসন, জগদীশ চন্দ্রকে, এ একবিংশ শতাব্দীতে পাব, সংকর, প্লেটো, অ্যারিস্টটলকে যদি গৃহে থাকে। একটি গ্রন্থাগার, তবে এঁদের সবারই সান্নিধ্য মিলবে, সেখানে উপলব্ধি করা যাবে তাঁদের নিঃশব্দ উপস্থিতি। দেখা যাবে প্রাচীন গ্রিস, মিশর, রােম, ভারত উপমহাদেশ পরস্পর তাকিয়ে আছে উৎসুক দৃষ্টিতে । যদি অন্তরে থাকে সঙ্গপ্রিয়তার প্রেরণা, যদি থাকে অধ্যবসায়, তবে বইয়ের পাতা চোখের সামনে মেলে ধরবে রহস্যময় এক বিশাল জগৎ। সুতরাং, বই পাঠের প্রয়ােজনীয়তা অপরিসীম। আর তাই মনীষী কার্লাইল On the choice of books প্রবন্ধে বলেছেন-The true university of our days is a collection of books.

বই পাঠের আনন্দ : বই মানুষকে দেয় অনাবিল আনন্দ। মানুষের উচ্চতর বৃত্তিগুলাে চায় সত্য জ্ঞান ও আনন্দের আলাে। আর একমাত্র বই-ই তার চাহিদা পূরণে সক্ষম। বই পাঠে আনন্দ পেয়েই ওমর খৈয়াম বলেছিলেন, “রুটি-মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালাে চোখ ঘােলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু বইখানা অনন্তযৌবনা-যদি তেমন বই হয়।” মনীষী বারট্রান্ড রাসেল বলেছেন, “সংসারে জ্বালা-যন্ত্রণা এড়াবার প্রধান উপায় হচ্ছে মনের ভিতর আপন ভুবন সৃষ্টি করে নেওয়া এবং বিপদকালে তার ভিতর ডুব দেয়া।” যে যত বেশি ভুবন সৃষ্টি করতে পারে, ভবযন্ত্রণা এড়াবার ক্ষমতা তার তত বেশি। আর বই পাঠের মাধ্যমেই একমাত্র ভুবন সৃষ্টি করা সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তা হলাে- বই নির্বাচন। মূলত বই পড়ার আনন্দ পরিপূর্ণ ভাবে লাভ করতে হলে বই মেলার অগণিত বই থেকে উপযােগী বই নির্বাচন করতে হয়। ছাপাখানার বদৌলতে প্রতিনিয়ত অজস্র বই ছাপা ও প্রকাশিত হচ্ছে। এর মধ্যে ভালাে-মন্দের সমাবেশ আছে। বিজ্ঞাপন আর গ্রন্থনামে প্রলুব্ধ না হয়ে বিচার-বিবেচনা করে বই নির্বাচন করা উচিত। সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস, বিজ্ঞান, ভ্রমণ কাহিনী থেকে শুরু করে বৈচিত্র্যময় বইয়ের ভাণ্ডার থেকে নির্বাচন সম্পন্ন করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

উল্লেখযােগ্য বই : পাঠকের যেমন রুচি এবং দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা রয়েছে, ঠিক তেমনই পাঠক উপযােগী বইয়ের মাঝেও রয়েছে বৈচিত্র্য। সব পাঠক যেমন এক মনের নয়, তেমনি সব বইও সব পাঠকের জন্য নয়। বিভিন্ন প্রকার বইয়ের মধ্যে উল্লেখযােগ্য হলাে- গল্প, কবিতা, ছড়া, উপন্যাস, নাটক, ভ্রমণকাহিনী প্রভৃতি বিজ্ঞান বিষয়ক বইও পাঠকদের ব্যাপক আনন্দ দিয়ে থাকে। উল্লেখ যােগ্য বইগুলাের মধ্যে নিম্নোক্ত বইগুলাে সত্যিই অসাধারণ। যেমন : রবীন্দ্রনাথের কাব্যগ্রন্থ সােনার তরী, বলাকা, মানসী, গীতাঞ্জলি; উপন্যাস শেষের কবিতা, চার অধ্যায়, নৌকাডুবি, দুবােন প্রভৃতি। কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যগ্রন্থ অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশি,দোলনচাঁপা, ছায়ানট, উপন্যাস রিক্তের বেদন, ব্যথার দান, মৃত্যুক্ষুধা প্রভৃতি। জীবনানন্দ দাশের কাব্যগ্রন্থ বনলতা সেন, রূপসী বাংলা। অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস শ্রীকান্ত, দেবদাস, পথের দাবি, গৃহদাহ প্রভৃতি। জহির রায়হানের উপন্যাস হাজার বছর ধরে, বরফগলা নদী। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস নন্দিত নরকে, শঙ্খনীল কারাগার ইত্যাদি।

উপসংহার : অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে সেতু রচনা করে যুগােত্তীর্ণ গ্রন্থরাজি। গ্রন্থের সাহচর্যে মানুষ অগ্রসর হয়ে চলে সভ্যতা- সংস্কৃতির বিবর্তন পথে। বইয়ের সঙ্গ তাই মানুষের একান্ত কাম্য । কত মানুষের চলার পদচিহ্ন পড়েছে পৃথিবীর বুকে-তাদের ছন্দকে ধরে রেখেছে বই। কত ভাষায় মানুষ কথা বলেছে, সেই কথা পীকৃত হয়ে আছে বইয়ের পৃষ্ঠায় । বিচিত্র মানুষের হূকম্পন অনুরণিত গ্রন্থরাজির পাতায় পাতায়। মানুষের একাকিত্বকে ঘুচিয়ে দেয় গ্রন্থের সাহচর্য। মানুষ মানুষের সঙ্গী, প্রকৃতিও মানুষের সঙ্গী। কিন্তু মানুষের আরাে এক সঙ্গী আছে, তা উৎকৃষ্ট গ্রন্থরাজি।

অপেক্ষাকৃত নতুন পুরনো