রচনা: কৃষিতে বিজ্ঞান
অথবা, কৃষিকাজে বিজ্ঞান
অথবা, কৃষিক্ষেত্রে বিজ্ঞানের অবদান

(সংকেত: ভূমিকা— বাংলাদেশের অবস্থান- কৃষির সূচনা— কৃষিক্ষেত্রে বিজ্ঞানের প্রভাব- উন্নত দেশ গুলাের কৃষি ব্যবস্থাপনা- বাংলাদেশের কৃষিতে বিজ্ঞানের প্রভাব- বৈজ্ঞানিক চাষাবাদ সমস্যা এবং বাংলাদেশ- উপসংহার)
কৃষিতে বিজ্ঞান

ভূমিকা: একুশ শতকের সূচনায় বিশ শতকের সমাপ্তিতে চোখ রাখলে আশ্চর্য হতে হয়। কেননা, বিজ্ঞান তার নব নব আবিষ্কারের মাধ্যমে বিশ্বকে আজ এমন এক পর্যায়ে উন্নীত করেছে যা আজ এক অপরিণত বালকের কাছেও স্পষ্ট। বিজ্ঞান ছাড়া আজকের পৃথিবীতে উন্নতির কথা ভাবাই যায় না। একেবারে সহজ-সরল কথায় বলতে গেলে আমরা বুঝি যে, বর্তমান যুগ প্রযুক্তির যুগ, বর্তমান যুগ বিজ্ঞানের যুগ। বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের ছোঁয়ায় যে সব শিল্প বা প্রতিষ্ঠান ধন্য হয়েছে আজকের কৃষি তার কোনাে অংশেই কম নয়। বরং পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়ে আজকের কৃষি যে রূপ লাভ করেছে তার মূলে রয়েছে বিজ্ঞান।

বাংলাদেশের অবস্থান: বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এদেশের শতকরা পঁচাশি জন লােক প্রত্যক্ষ বা পরােক্ষ ভাবে কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। দুঃখের বিষয় হলেও একথা সত্য যে, এখনও এদেশের কৃষক সম্প্রদায় সেই চিরাচরিত সনাতন পদ্ধতিতে কৃষিকাজ করে চলছে। ভাবতেও অবাক লাগে যখন উন্নত বিশ্বের দেশ গুলাে মহাশূন্যে অভিযানের প্রতিযােগিতা চালিয়ে যাচ্ছে তখন আমাদের দেশের কৃষকরা সেই গতানুগতিক পদ্ধতিতে কৃষিকাজ করছে। সেই পুরনাে পদ্ধতির লাঙল ও একজোড়া গরু এখনও কৃষি ব্যবস্থায় প্রধান হাতিয়ার রূপে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর ফলে শস্য উৎপাদন আশানুরূপ হচ্ছে না।

কৃষির সূচনা : যেদিন থেকে মানুষ আগুন জ্বালাতে শিখল, যেদিন সে পাথরের অস্ত্র নিয়ে বন্য পশুর সাথে যুদ্ধ আরম্ভ করল, যেদিন সে চাকা তৈরি করল সেদিন থেকেই বিজ্ঞানের জয়যাত্রা শুরু হলাে। মানুষ যেদিন আবিষ্কার করল অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় তার ক্ষুদ্র অবয়বে রয়েছে। একটি সূক্ষ্ম অথচ প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন মস্তিষ্ক, সেদিন থেকেই প্রকৃতির রহস্য ভেদ করার জন্য নব নব তত্ত্ব আবিষ্কার করল সে। প্রকৃতিকে আবিষ্কার করার নেশায় হয়ে উঠল সে অস্থির। প্রকৃতির দেওয়া শস্য সম্পদে সে সন্তুষ্ট থাকতে পারেনি। সে কৃষিশিক্ষা অর্জন করে নিজের রুচির পরিতৃপ্তি ও পরিপুষ্টি সাধনে আত্মনিয়ােজিত হলাে।

কৃষিক্ষেত্রে বিজ্ঞানের প্রভাব : মানুষ খাদ্যের জন্য কৃষির ওপর নির্ভরশীল। আজ বিজ্ঞানের প্রভাবে কৃষিকাজ আদিম র পেরিয়ে আধুনিক স্তরে পৌছেছে। সুপ্রাচীনকাল থেকে আমাদের দেশে গরু বা মহিষ দ্বারা লাঙল চালিয়ে কৃষিকাজ করা হতাে। এখন গরুর লাঙলের পরিবর্তে এসেছে কলের লাঙল, ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার । এতে একদিকে যেমন শ্রমের ব্যয় হ্রাস পেয়েছে তেমনই জমিও কর্ষিত হচ্ছে গভীরভাবে। ফলে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। জলসেচ ব্যবস্থা, উন্নত বীজ, সরবরাহ, ভূমি সংরক্ষণ প্রভৃতির প্রভূত উন্নতি কৃষিতে বিজ্ঞানেরই অবদান। পৃথিবীতে আজ জনসংখ্যা দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু সে অনুপাতে আবাদযােগ্য কৃষিজমির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে না। ফলে সীমিত কর্ষণযােগ্য জমিতে মানুষের অন্ন সংগ্রহের প্রয়াস বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে জরুরি কাজ বলে বিবেচিত হচ্ছে। আর এজন্য প্রয়ােজন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ। বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে দিন দিন খাদ্যশস্য উৎপাদনের পরিমাণ উল্লেখ যােগ্য হারে বেড়ে চলছে।

উন্নত দেশগুলাের কৃষি ব্যবস্থাপনা : উন্নত দেশসমূহের কৃষিকাজ সম্পূর্ণভাবে বিজ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল। জমি কর্ষণ, বীজবপন, সেচ কাজ; ফসল কাটা, মাড়াই বাছাই ইত্যাদি সব কাজ আজ যন্ত্রের সাহায্যে সম্পাদন করা হয়। ট্রাক্টরের সাহায্যে জমি চাষ করে মেশিন দিয়ে জমিতে বীজ বপন করা হয়। তার আগে বপনের জন্য সংরক্ষিত বীজ বাছাই কাজও যন্ত্র দ্বারা করা হয়। বর্তমান যুগে মানুষ গভীর নলকূপ এবং পাম্পের সাহায্যে জমিতে সেচ দেয়। সব উন্নত দেশ আজ কৃষিকে যান্ত্রিক করে তুলেছে। শীতপ্রধান দেশ গুলাে গ্রিন হাউজের সাহায্যে গ্রীষ্মপ্রধান দেশের মতাে শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদন করছে। বিজ্ঞানের সাহায্যে বর্তমানে বিশুষ্ক মরুভূমির মতাে জায়গাতেও সেচ, সার ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় চাষাবাদ করে সােনার ফসল ফলানাে হচ্ছে। সর্বোপরি বিজ্ঞান কৃষিকার্যে এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটিয়েছে।

বাংলাদেশের কৃষিতে বিজ্ঞানের প্রভাব : আমাদের দেশেও আজ কৃষিকাজে বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে। জমি কর্ষণে ব্যাপকভাবে ট্রাক্টরের ব্যবহার করা যাচ্ছে না জমির খণ্ড-বিখণ্ডতার কারণে। সেচ কাজে মানুষ এখন চাতকের ন্যায় বৃষ্টিধারার জন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে না। এখন সেচের জন্য ব্যবহার করা হয় গভীর নলকূপ, পাম্প ইত্যাদি। উন্নত ধরনের বীজ সংরক্ষণে বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হয়। খেতে পােকার আক্রমণ হলে তা দমনের ব্যবস্থা নেওয়া হয় ব্যাপকভাবে বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির সাহায্যে। রাসায়নিক সার ব্যবহার করে ফসলের ফলন বাড়ানাে হচ্ছে।জমিতে আগে যেখানে এক ফসল হতাে, বিজ্ঞানের অবদানে এখন সেখানে তিন ফসল পর্যন্ত হয়। আমাদের দেশের কৃষি কাজকে এখনও পুরােপুরি যান্ত্রিক করা যায়নি। বিজ্ঞানের অবদানকে দেশের চাষাবাদের ক্ষেত্রে লাগাতে পারলে আমাদের খাদ্য সমস্যা বহুলাংশে সমাধান করা সব হবে।

বৈজ্ঞানিক চাষাবাদ সমস্যা এবং বাংলাদেশ : কৃষকেরা অর্থাভাবে হালের গরু বিক্রি করে, দিনমজুরি করে, অতিকষ্টে অন্ন সংস্থান করে। তারা দরিদ্র বলে অর্থব্যয় করে চাষাবাদের উপযােগী আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ক্রয় করতে পারে না। বর্তমানে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শ্লোগান শােনা যাচ্ছে, “অধিক খাদ্য ফলাও”-এ আন্দোলনকে ফলপ্রসূ করা সম্ভব যদি কৃষিকাজে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় । যাতে কম মূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি কৃষক সম্প্রদায়ের হাতে পৌছে সেদিকে লক্ষ রাখা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি আমরা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতে পারছি না কৃষকের অজ্ঞতার কারণে। এ থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমে দেশে শিক্ষার হার বাড়াতে হবে। কৃষকদের আধুনিক পদ্ধতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। এজন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আশার কথা বর্তমানে সরকার ও বিভিন্ন এনজিও গ্রাম্য যুবকদের কৃষি পদ্ধতি সম্বন্ধে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে।

উপসংহার : বিজ্ঞান সমৃদ্ধির চাবিকাঠি। কৃষি ক্ষেত্রেও তার ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। আমাদের বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষির উন্নতির মাধ্যমেই আমাদের দেশের সামগ্রিক উন্নতি সম্ভব। এজন্য আমরা যদি বিজ্ঞান ভিত্তিক বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণে সক্ষম হই তবে সবাই কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে পারব,

“ধন ধান্যে পুষ্পভরা
 আমাদের এই বসুন্ধরা
তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা;
ও সে স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সে দেশ স্মৃতি দিয়ে ঘেরা
এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি
সকল দেশের রানী সে যে
আমার জন্মভূমি।”

অপেক্ষাকৃত নতুন পুরনো