সাম্প্রতিককালে কম্পিউটার জগতে আলােড়ন সৃষ্টিকারী প্রযুক্তিসেবার মধ্যে রয়েছে ক্লাউড কম্পিউটিং। বর্তমান আইসিটির যুগে সবকিছুই চলছে ক্লাউড কম্পিউটিং ধারণার উপর নির্ভর করে। ক্লাউড কম্পিউটিং-এর ধারণা কম্পিউটার জগতে এক যুগান্তকারী বিপ্লবের সূচনা করেছে। ক্লাউড কম্পিউটিং মানে ইন্টারনেটভিত্তিক সার্ভিস, সফটওয়্যার বা হার্ডওয়্যার ভাড়া নেয়া অর্থাৎ আউটসাের্সিং করা। বর্তমানে আমরা যারা কম্পিউটার বা মােবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার করি তাদের প্রায় সকলেরই facebook account বা e-mail account রয়েছে। আমাদের যখন ইচ্ছে তখন আমরা আমাদের facebook account এ status দিচ্ছি বা e-mail account এর মাধ্যমে mail আদান-প্রদান করছি।
এমনকি এ status গুলাে বা mail গুলাে নিজে মুছে না ফেলা পর্যন্ত সেগুলাে ইন্টারনেটের মাধ্যমে দেখতেও পাচ্ছি। কখনাে কি ভেবে দেখেছ এই কাজগুলাে কোথায়, কোন দেশের কম্পিউটারে প্রসেস হয় বা জমা থাকে? আসলে আমরা ব্যবহারকারীরা কেউই জানি না কাজগুলাে কোথায়, কোন দেশের কম্পিউটারে প্রসেস হয় বা জমা থাকে। কারণ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই সার্ভিস প্রদানকারী কোম্পানিগুলাের বিপুলসংখ্যক সার্ভার রয়েছে, যার মাধ্যমে তারা অসংখ্য client কে এ সকল সার্ভিস প্রদান করছে। এখানে যে সার্ভিসগুলাের কথা বলা হলাে সেগুলাে আমরা বিনামূল্যে পেয়ে থাকি। এছাড়া আরও এমন অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা অর্থের বিনিময়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের সার্ভিস প্রদান করে থাকে যেমন- website registration, website hosting ইত্যাদি। এগুলাে সবই cloud computing হিসেবে পরিচিত।

অর্থাৎ ক্লাউড কম্পিউটিং হলাে একগুচ্ছ রিমােট সার্ভারের কম্পিউটার রিসাের্স যেমন— হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার, নেটওয়ার্ক ইত্যাদি ব্যবহার করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের সার্ভিস প্রদান করা।

এক্ষেত্রে কম্পিউটার রিসাের্সগুলাে সার্ভিস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে থাকে, ক্রেতা বা ব্যবহারকারী শুধু ছােট ও কম মূল্যের কম্পিউটার ব্যবহার করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে সার্ভিসদাতার সার্ভারের সাথে সংযােগ স্থাপন করে প্রয়ােজনীয় কম্পিউটিংয়ের কাজ সম্পাদন করে। যেহেতু সার্ভিসদাতার অবকাঠামােগত রিসাের্সসমূহ ক্রেতা বা ব্যবহারকারীর কাছে দৃশ্যমান থাকে না, তাই এর নামকরণ করা হয়েছে ক্লাউড কম্পিউটিং। বর্তমানে ক্লাউডের ধারণা হলাে একটি বড় ধরনের ডেটা সেন্টার যেখানে হাজার হাজার সার্ভারের মাধ্যমে অজস্র ক্লায়েন্টের জটিল সব সমস্যার সমাধান অনেক সহজে করা যায়।ক্লাউড কম্পিউটিং মূলত নির্দিষ্ট কোনাে টেকনােলজি নয়, বরং এটি একটি ব্যবসায়িক মডেল।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং-এর সংজ্ঞা অনুসারে, বিভিন্ন ধরনের কম্পিউটার রিসাের্স যেমন- নেটওয়ার্ক, সার্ভার, স্টোরেজ, সফটওয়্যার ও সার্ভিস নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ক্রেতার সুবিধা অনুসারে,চাহিবামাত্র ও চাহিদা অনুসারে, সহজে ব্যবহার করার সুযােগ প্রদান বা ভাড়া দেয়ার সিস্টেমকে বলা হয় ক্লাউড কম্পিউটিং।
ক্লাউড কম্পিউটিং-এর বৈশিষ্ট্য (Characteristics of Cloud Computing) 
ক্লাউড কম্পিউটিং হলাে ক্রেতার তথ্য ও বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশনকে কোনাে সার্ভিসদাতার সিস্টেমে আউটসাের্স করার এমন একটি মডেল যেখানে প্রধান ৩টি বৈশিষ্ট্য থাকবে
১. Resource Flexibility: ছােট বা বড় যেকোনাে ক্রেতার সব রকম চাহিদা মেটানাে হবে, ক্রেতা যত চাইবে সার্ভিসদাতা তত অধিক পরিমাণে সার্ভিস দিতে পারবে।
২. On Demand: ক্রেতা যখনই চাইবে সার্ভিসদাতা তখনই সার্ভিস দিতে পারবে। ক্রেতা যখন ইচ্ছে তখন তার চাহিদা বাড়াতে বা কমাতে পারবে।
৩. Pay as you go: ক্রেতাকে আগে থেকেই কোনাে সার্ভিস রিজার্ভ করতে হবে না। ক্রেতা যতটুকু ব্যবহার করবে শুধুমাত্র ততটুকুর জন্য মূল্য পরিশােধ করবে।

ক্লাউড কম্পিউটিং পদ্ধতিকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
প্রাইভেট ক্লাউড (Private cloud) : প্রাইভেট ক্লাউড হলাে সম্পূর্ণভাবে একটি একক প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কিংবা থার্ড পার্টির ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয় এমন একটি ক্লাউড অবকাঠামাে, যা অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এ ধরনের ক্লাউড পরিচালনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, তবে অনেক বড় প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলাে শাখায় ডেটা সেন্টার না বসিয়ে একটিমাত্র ক্লাউড ডেটা সেন্টার স্থাপন করলে প্রতিষ্ঠানটির জন্য তা সাশ্রয়ী হবে।
পাবলিক ক্লাউড (Public cloud) : যে ক্লাউডের সার্ভিসগুলাে ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংযুক্ত সকলের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত তাকে পাবলিক ক্লাউড বলে। এক্ষেত্রে সার্ভিসগুলাে (অ্যাপ্লিকেশন, স্টোরেজ এবং অন্যান্য রিসাের্স) বিনামূল্যে বা স্বল্প ব্যয়ে ব্যবহার করা যায়। পাবলিক ক্লাউড সার্ভিস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান যেমন— Amazon, Microsoft এবং Google তাদের
নিজস্ব ডেটা সেন্টারে পাবলিক ক্লাউডের অবকাঠামাে স্থাপন ও পরিচালনা করার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের সার্ভিস প্রদান করে থাকে।
হাইব্রিড ক্লাউড (Hybrid cloud) : দুই বা ততােধিক ধরনের ক্লাউড (প্রাইভেট, পাবলিক বা কমিউনিটি) এর সংমিশ্রণই হলাে হাইব্রিড ক্লাউড। বিভিন্ন ধরনের ক্লাউড পৃথক বৈশিষ্ট্যের হলেও এক্ষেত্রে একই সাথে সংঘবদ্ধভাবে কাজ করে।হাইব্রিড ক্লাউড এক বা একাধিক ক্লাউড সার্ভিসকে একীভূত করে একটি ক্লাউড সার্ভিসের ক্ষমতা বর্ধিত করে বা সীমাবদ্ধতা।
অতিক্রম করে।এছাড়া ক্লাউড কম্পিউটিং-এর অন্যান্য ধরনের মধ্যে রয়েছে কমিউনিটি ক্লাউড (Community cloud), ডিস্ট্রিবিউটেড ক্লাউড(Distributed cloud), মাল্টিক্লাউড (Multicloud), ইন্টারক্লাউড (Intercloud) ইত্যাদি।

ক্লাউড কম্পিউটিং-এর সার্ভিস মডেল (Service Model of Cloud Computing) : বিভিন্ন ধরনের মৌলিক মডেল অনুসারে ক্লাউড কম্পিউটিং সার্ভিসদাতা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরনের সার্ভিস প্রদান করে থাকে। এ সকল সার্ভিস মডেলকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথাঃ
Infrastructure as a Service - Iaas (অবকাঠামােগত সেবা) : এই মডেলে ভাড়া দেয়া হয় অবকাঠামাে।আমাজন-এর ইলাস্টিক কম্পিউটিং ক্লাউড (EC2) এরকম একটি মডেল। EC2 এর প্রতিটি সার্ভারে 1 থেকে ৪টি ভার্চুয়াল মেশিন চলে, ক্রেতারা এগুলােই ভাড়া নিয়ে থাকেন। ব্যবহারকারীরা ভার্চুয়াল মেশিনে নিজের ইচ্ছেমতাে অপারেটিং সিস্টেম
ইন্সটল করে নিজের নিয়ন্ত্রণে অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার চালাতে পারেন ।

Platform as a service - Paas (প্লাটফর্মভিত্তিক সেবা) : এই মডেলে ভার্চুয়াল মেশিন ভাড়া না দিয়ে ভাড়া দেয়া হয় কম্পিউটিং প্লাটফর্ম, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত অপারেটিং সিস্টেম, প্রােগ্রামিং ল্যাংগুয়েজ এক্সিকিউশন পরিবেশ, ডেটাবেজ এবং ওয়েব সার্ভার ইত্যাদি। এই প্লাটফর্মে ব্যবহারকারী স্বল্প ব্যয়ে তার অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার উন্নয়ন ও run করতে পারেন।Microsoft এর Azure এবং Google এর App Engine এই মডেলের উদাহরণ।

software as a Service - Saas (সফটওয়্যারভিত্তিক সেবা) ; এই মডেলে ব্যবহারকারীরা সার্ভিসদাতা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন করা সফটওয়্যার ও ডেটাবেজে অ্যাকসেস ও ব্যবহারের সুযােগ পায়। এর ফলে ব্যবহারকারীকে সিপিইউ বা
স্টোরেজের অবস্থান, কনফিগারেশন ইত্যাদি জানা বা রক্ষণাবেক্ষণ করার প্রয়ােজন হয় না।এছাড়া আরও যে সকল সার্ভিস মডেল রয়েছে সেগুলাে হলাে-
Network as a Service - Naas, Data as a Service - DaaS. Database as a Service - DBaas, Security as a Service - SEaas ইত্যাদি।
ক্লাউড কম্পিউটিং-এর সুবিধা ও অসুবিধা(Advantages and Disadvantages of Cloud Computing) :
সব ধরনের ব্যবসায়িক কাজে ক্লাউড কম্পিউটিং বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দিয়ে থাকে। তবে এ সকল সুবিধার পাশাপাশি কিছু অসুবিধাও রয়েছে।

ক্লাউড কম্পিউটিং-এর সুবিধা:
১. ছােট ও প্রাথমিক উদ্যোক্তাদের জন্য সহজেই ব্যবসা করার সুযােগ সৃষ্টি।
২. সার্বক্ষণিক ব্যবহারযােগ্য।
৩.যেকোনাে সময় যেকোনাে স্থান থেকে তথ্য আপলােড এবং ডাউনলােড করা যায়।
৪. হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার, লাইসেন্স ফি এর জন্য অধিক অর্থ ব্যয় করতে হয় না।
৫.কম সংখ্যক জনবল দিয়ে অধিক কাজ করার সুবিধা।
৬, পরিচালনা ব্যয় কম এবং কোনাে প্রশিক্ষণের প্রয়ােজন হয় না।
৭. স্বয়ংক্রিয়ভাবে সফটওয়্যার আপডেট হয় এবং সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

ক্লাউড কম্পিউটিং-এর অসুবিধা:
১. ক্লাউডে আপলােড করা তথ্য কোথায় সংরক্ষিত হয় তা জানা যায় না।
২. ক্লাউডে ব্যবহৃত তথ্য বা ডেটার উপর ব্যবহারকারীর একক নিয়ন্ত্রণ থাকে না।
৩.ক্লাউডে ব্যবহৃত তথ্য কোথায় প্রসেস হচ্ছে ব্যবহারকারী তা জানতে পারে না।
৪.ক্লাউডে তথ্যের নিরাপত্তা ও গােপনীয়তা রক্ষার নিশ্চয়তা কম।
৫. ক্লাউডে ব্যবহৃত প্রােগ্রাম বা সফটওয়্যারের উপর ব্যবহারকারীর নিয়ন্ত্রণ থাকে না।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন