মানুষ যখন দলবদ্ধ হয়ে বসবাস শুরু করল প্রকৃত পক্ষে তখন থেকেই ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার প্রয়ােগ শুরু হয়। দলবদ্ধ ও সমাজবদ্ধ মানুষ জীবন ও জীবিকার প্রয়ােজনে পশু শিকার থেকে শুরু করে নানাবিধ সামাজিক কর্মকাণ্ডে দলনেতার নির্দেশ অনুসারে কাজ করতে শুরু করে। ক্রমে ক্রমে মানুষ সভ্যতার দিকে এগিয়ে যায়। শুরু হতে থাকে সমাজপতি, দলনেতা, পুরােহিত, ধর্মযাজক, সামন্ত প্রভু, রাজা-মহারাজা, ব্যবসায়ী, মহাজন প্রভৃতি ব্যক্তিবর্গ দ্বারা ব্যবসা- বাণিজ্য, শিল্প, কলকারখানা, সমাজ, দেশ ও জাতির পরিচালনা ব্যবস্থা। আর এসব ব্যবস্থায় যুগে যুগে আধুনিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন কৌশলের প্রয়ােগ পরিলক্ষিত হয়। এছাড়া যুগে যুগে বিভিন্ন ধর্মানুসারী ঐশী জ্ঞান ও শক্তিপ্রাপ্ত মহামানবগণ মানব জাতিকে সর্বোৎকৃষ্ট ভাবে দেশ ও রাষ্ট্র পরিচালনা, সমাজ ও ব্যবসায় বাণিজ্যসহ সার্বিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার যেসব নিয়ম-নীতি ও পদ্ধতির প্রবর্তন করে গেছেন তারই হাত ধরে যুগে যুগে প্রাচীন কালের ক্যাথলিক চার্চ প্রধান থেকে শুরু করে আজকের দক্ষতা সম্পন্ন ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞগণ যুগােপযােগী ধ্যান-ধারণায় ব্যবস্থাপনাকে সমৃদ্ধ করেছেন; নানা কলাকৌশল ও প্রথার প্রচলন, উন্নয়ন ও বিকাশ সাধন করেছেন; নানা তত্ত্ব ও তথ্যে ব্যবস্থাপনা জ্ঞান ও কৌশলে উন্নত ব্যবস্থাপনার আধুনিক রূপদান করেছেন। যার হাত ধরেই আজকের কম্পিউটার ভিত্তিক ব্যবস্থাপনার প্রবর্তন।

বিভিন্ন ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞের মতামতের ভিত্তিতে ব্যবস্থাপনার ক্রমবিকাশকে বিভিন্ন কাল বা যুগে বিভক্ত করে নিমােক্ত ধাপে প্রদর্শন করা যেতে পারে:


১: প্রাচীন যুগ

রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি (প্রাচীন মেসােপটেমিয়া, রােম, চীন, মিশর, সিরিয়া, রােমান ও সিন্ধু উপত্যকার সভ্যতা)।

২: মধ্যযুগ-

সামন্তবাদ, যুদ্ধ ও সামরিক কলাকৌশল, ব্যবসায়, পুঁজি ব্যবস্থাপনা ও হিসাব ব্যবস্থার উন্নয়ন (রােম, ইতালি, যুক্তরাজ্য ও আরব রাষ্ট্রসমূহ)

৩: প্রাক-বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা কাল বা শিল্প বিপ্লব কাল-

শ্রমবিভাজন , ব্যাপক উৎপাদন, বণ্টন ও বিশেষজ্ঞতার উন্নয়ন (অ্যাডাম স্মিথ, জেমস স্টুয়ার্ট, চার্লস ব্যাবেজ প্রমুখের অবদান )

৪: বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা কাল-

(টেলর ও হেনরি ফেয়ল-এর অবদান)

৫. বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা উত্তরকাল বা আধুনিক যুগ-

(মানবিক সম্পর্ক ও মানব আচরণ সম্পর্কিত বিষয়াদি)


১. প্রাচীন যুগ (খ্রিঃ পূঃ ৫০০০ অব্দ থেকে ৩৫০ অব্দ পর্যন্ত):

ক্যাথলিক চার্চ প্রধান, লাওজ্যে, এরিস্টটল, প্লেটো, সক্রেটিস, স্যানজু, কৌটিল্য প্রমুখ ব্যক্তিত্ব ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখেন। এসব নেতৃবর্গ ব্যবস্থাপনার যেসব দিকের অগ্রগতি সাধন করেন তা হলাে ব্যক্তি নেতৃত্ব, দলীয় নেতৃত্ব, রাষ্ট্র পরিচালনা, শ্রম বিভাগ, বিশেষায়ন, সংগঠন, কেন্দ্রীকরণ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়, সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা, সামরিক সংগঠন, উপদেষ্টার ব্যবহার, সিস্টেম মডেল, মান ও দায়িত্ব বণ্টন, পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি। সুমেরিয়ান সভ্যতা, মিসর, ব্যাবিলন, মেসােপটেমিয়া, হিব্রু, চীন সভ্যতা, গ্রিক, সিরিয়া, রােমান সভ্যতা, সিন্ধু উপত্যকার সভ্যতায় ব্যবস্থাপনার এসব বিষয়সমূহের অগ্রগতি সাধিত হয় ।


২. মধ্যযুগ (৩৫০ খ্রিঃ পূঃ থেকে ১৭৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত) :

ইমাম গাজ্জালী, আল ফারাবি, লুকা প্যাসিওলি, আরস্যানাল অব ভেনিস, থমাস মূর, নিকোলাে মেকিয়াভেলি, রিচার্ড আর্করাইট, ফ্রানসিসকো ডি, মার্কো প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ নেতৃত্বের গুণাবলি, ক্ষমতার্পণ, শ্রম বিভাগ, ব্যাপক উৎপাদন, কারখানা বিন্যাস, মজুদ নিয়ন্ত্রণ, মজুরি প্রথা, মান নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, দু'তরফা হিসাবরক্ষণ পদ্ধতি, হিসাব ব্যবস্থা প্রভৃতি বিষয়ে ব্যবস্থাপনার উন্নতি সাধন করেন। রােম, ভারত, ইতালি, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং আরব রাষ্ট্রসমূহ এসবের অগ্রগতিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।


৩. প্রাক বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা কাল (শিল্প বিপ্লব কাল : ১৭৫১ - ১৮৫০ সাল):

যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানির প্রখ্যাত নেতৃবর্গ অ্যাডাম স্মিথ, জেমস স্টুয়ার্ট, জেমস ওয়াট, রবার্ট ওয়েন, চার্লস ব্যাবেজ, রবিনসন, হারগ্রীভস বােল্টন, ইউরি এন্ড্রো, মারডক প্রমুখ ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে অবদান রাখেন। উৎপাদন পরিকল্পনা, আদর্শ মান নির্ণয়, যন্ত্রপাতি বিন্যাস, বাজার গবেষণা, শ্রম বিভাগ, পূর্বানুমান মূল্য নিরূপণ, প্রশিক্ষণ, কার্যভিত্তিক মজুরি, কর্মী মূল্যায়ন, কার্য মূল্যায়ন, শ্রম কল্যাণ কর্মসূচি, অপারেশন রিসার্চ, ব্যয় হিসাব, কম্পিউটার প্রযুক্তি ইত্যাদির এসময়ে যথেষ্ট উন্নতি হয় ।


৪. বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা কাল (১৮৫১ -১৯৩০ সাল):

ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনা বিশেষ এফ ডব্লিউ টেলর, হেনরি ফেয়ল, হেনরি লরেন্স প্যান্ট, হেরিংটন ইমারসন, ফ্রাঙ্ক গিলব্ৰেথ, লিলিয়ান গিলব্ৰেথ, অলিভার শেলডন, মেরিপার্কার ফোটে, হিউগাে মিনজবার্গ প্রমুখ বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা, ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ও তত্ত্ব, সময় নিরীক্ষা, শ্রান্তি নিরীক্ষা,কার্যাংশ গবেষণা, প্রণােদনামূলক মজুরি, ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ ইত্যাদি এসময়কালে ব্যাপকভাবে উন্নতি লাভ করে ।


৫. আধুনিক যুগ (বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা উত্তরকাল ১৯৩০- বর্তমান পর্যন্ত):

যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, জাপান, চীন, যুগােশ্লাভিয়া, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া প্রভৃতি দেশের বিশেষজ্ঞগণ ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখেন। এলটন মেয়াে, চেস্টার আই, বার্নার্ড, ডগলাস ম্যাকগ্রেগর, রেনসিস লিকার্ট, হার্বার্ট সাইমন, আর সি ডেভিস, পিটার এফ. ড্রাকার, উইলিয়াম আউচি, হার্জবার্গ, আব্রাহাম এইচ মাসলাে, ই এফ এল ব্রেক, নিউম্যান, কুঞ্জ ও ওডােন্যাল, জর্জ আর টেরী, রবার্ট ওয়াটারম্যান প্রমুখ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞগণ ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক পর্যায়ে নিয়ে আসেন। সাংগঠনিক আচরণ তত্ত্ব, দলীয় সম্পর্ক তত্ত্ব, চাহিদা তত্ত্ব, রৈখিক অনুক্রমণ তত্ত্ব, ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন তত্ত্ব, ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞান, কার্যাংশ গবেষণা, শ্রম কল্যাণ তত্ত্ব, শিল্প সম্পর্ক, নেতৃত্ব, মানবিক সম্পর্ক, স্টাটিসটিকেল কোয়ালিটি কন্ট্রোল, ইকনমিক অর্ডার কোয়ানটিটি, কম্পিউটার প্রযুক্তির ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়সমূহের অগ্রগতি ব্যবস্থাপনাকে চূড়ান্ত রূপ দিতে সক্ষম হয়েছে।

অপেক্ষাকৃত নতুন পুরনো