ক্রায়ােসার্জারি কী? গ্রিক শব্দ ক্রাউস (kruos) হতে ক্রায়াে (Cryo) শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ হলাে বরফের মতাে ঠাণ্ডা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের শল্য (Surgery) শাখায় শব্দটিকে ব্যবহার করে যে চিকিৎসা পদ্ধতি চালু রয়েছে তার নাম ক্রায়ােসার্জারি। একে কখনাে কখনাে ক্রায়াে থেরাপি বা ক্রায়ােবােলেশন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এটি একটি পুরাতন ও নতুন পদ্ধতি যা দীর্ঘদিন ধরে রােগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আক্রান্ত ক্ষত চিকিৎসার জন্য খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫০০ অব্দে ঠাণ্ডা পদ্ধতি ব্যবহারের যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রাচীন মিসরীয়রা এবং পরবর্তীকালে হিপােক্রেটিসরা বুকের সংক্রমণ জনিত ক্ষত, মাথার খুলি ফেটে যাওয়া কিংবা যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈনিকদের চিকিৎসায় এ পদ্ধতি ব্যবহারে সচেতন ছিল । ১৮৫০ সালে আরনট সর্বপ্রথম এ সম্পর্কে ধারণা ব্যক্ত করেন তথা কোষসমূহকে অবশ করে ব্যথা নিবারণ করার চেষ্টা করেন। যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে এনেসথেশিয়া বা অবশ বলা হয়। ক্যান্সার কোষ সমূলে উপড়ে ফেলার জন্য তিনি লবণের দ্রবণের সাথে বরফের কুচির সংমিশ্রণ ঘটিয়ে তাপমাত্রাকে -১৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড থেকে ২৪ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে নামিয়ে তা স্তন ও জরায়ুর ক্যান্সার আক্রান্ত স্থানে ব্যবহার করেন। পরবর্তীকালে বিভিন্ন উপাদান এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। যেমন তরল কার্বন ডাই-অক্সাইড । বর্তমানে তরল নাইট্রোজেন গ্যাস (অথবা আরগন গ্যাস) ব্যবহার করা হয়, যা তাপমাত্রাকে -১৬৯ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড থেকে -২০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে নামিয়ে আনতে পারে।

ক্রায়োসার্জারির জনক কে? ১৮৫০ সালে আরনট সর্বপ্রথম এ সম্পর্কে ধারণা ব্যক্ত করেন তথা কোষসমূহকে অবশ করে ব্যথা নিবারণ করার চেষ্টা করেন। এলিংটন ১৯৫০ সালে এ পদ্ধতিটি অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধিকে ধ্বংস করতে প্রয়ােগ করেন। আপনারা হয়তাে লক্ষ করে থাকবে যে, খেলার মাঠে আঘাত জনিত আহত খেলােয়াড় যে স্থানে আঘাত প্রাপ্ত হয়েছে সে স্থানে দ্রুত স্প্রে করা হয়। এতে করে তাৎক্ষণিক ভাবে সে ব্যথামুক্ত হয় এবং আবার খেলায় ফিরতে পারে। তবে ক্রায়ােসার্জারি চিকিৎসাতে আক্রান্ত কোষকে জমাট বাঁধাতে গ্যাসের ব্যবহারভেদে তাপ মাত্রার ভিন্নতা লক্ষ করা যায়।

কত তাপমাত্রায় ক্রায়োসার্জারি সেলগুলোকে ধ্বংস করার কাজ করে এবং কোন কোন গ্যাস ব্যাবহৃত হয় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কারন সঠিক তাপমাত্রা না হলে সার্জারি ঠিকমতো কাজ করবে না। ক্রায়াে সার্জারিতে ব্যবহৃত গ্যাসসমূহ ও প্রয়ােগকৃত তাপমাত্রা ছক আকারে দেখানাে হলাে:

★ তরল নাইট্রোজেন------------------ 196°C
★ ডাই মিথাইল ইথার প্রােপেন ----- 41°C
★ নাইট্রাস অক্সাইড------------------- 89°C
★ তরল অক্সিজেন-------------------- 182.9°C
★ সলিড কার্বন ডাই অক্সাইড-------79°C

ক্রায়ােসার্জারির উদ্দেশ্য: ত্বকের উপর বিবেচনা যােগ্য কোনাে কিছুর বৃদ্ধি যেমন ভাইরাস বা অন্য কোনো কারনে গোলাকার ফুসকুড়ি, প্রাক ক্যান্সার ক্ষত অথবা কোষের ক্ষতিকর ক্ষত ইত্যাদি বিনাশ করতে ক্রায়ােথেরাপি ব্যবহার করা হয়। এ পদ্ধতি বর্তমানে বিশ্বে বিভিন্ন চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে।

 ক্রায়োসার্জারি চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহৃত হয় যেসব ক্ষেত্রে তা হলো-
 প্রােস্টেটের টিউমার, যকৃৎ, ফুসফুস, স্তন, মস্তিষ্ক, চোখের ছানি, প্রসূতি সমস্যাসহ অন্যান্য রােগে। ক্রায়ােথেরাপির মূল লক্ষ্য হলাে ত্বকের আক্রান্ত স্থানের কোষসমূহকে হিমায়িত করে ধ্বংস করা এবং এদের পার্শ্ববর্তী কোষসমূহকে ক্ষতির হাত থেকে সুরক্ষা করা। আধুনিক যুগে ক্রায়ােথেরাপি হলাে এমন একটি পদ্ধতি যার মাধ্যমে অপ্রত্যাশিত ত্বক কোষকে হিমায়িত এবং ধ্বংস করে অপসারণ করা হয়।

ক্রায়ােসার্জারি চিকিৎসা পদ্ধতি : উপরের যে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উল্লেখ করা হয়েছে, তার যে অংশে ক্রায়ােথেরাপি বা ক্রায়ােসার্জারি করা হবে সে অংশের আক্রান্ত কোষগুলাের যথাযথ অবস্থান শনাক্ত এবং এর সীমানা নির্ণয় করা হয় সিমুলেটেড সফটওয়্যারের মাধ্যমে। যেমন যকৃৎ ক্যান্সারের ক্ষেত্রে SKALPEL-ICT (Simulation Kernel Applied to the Planning and Evaluation of Image-guided Cryotherapy) সিমুলেটেড সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে এ ধরনের অসংখ্য সফটওয়্যার রয়েছে যার সাহায্যে একজন শিক্ষার্থী প্রকৃত সার্জারি কাজে অংশগ্রহণ করার পূর্বে বারবার অনুশীলন করে দক্ষ  হতে পারে।

কিছু কিছু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রয়েছে যেখানে প্রকৃতপক্ষে হাতে-কলমে কাজ করে দক্ষতা অর্জন প্রায় অসম্ভব। যেমন- পেটের নাড়ির ক্ষত, চোখের ভেতরের ক্ষত, জরায়ুর ক্ষত, মস্তিষ্কের ভেতরের ক্ষত ইত্যাদি। এ সকল ক্ষেত্রে ক্রায়ােসার্জারি বা ক্রায়ােথেরাপি সিমুলেটেড সফটওয়্যার ব্যবহার করে ত্রিমাত্রিক এমনকি বহুমাত্রিক ছবি তৈরি করে সফলভাবে চিকিৎসা কাজ করা সম্ভব। সাধারণত চামড়ায় ছােট ছিদ্র করে তার মধ্য দিয়ে ক্রায়ােপ্রােব (মাইক্রো-ক্যামেরাযুক্ত নল যা দিয়ে ক্ষতস্থানের শনাক্ত করা হয়) প্রবেশ করিয়ে মাত্রাতিরিক্ত ঠাণ্ডা তরল নাইট্রোজেন প্রয়ােগ করে ক্ষতস্থানের কোষ ধ্বংস করা হয় বলে সার্জারি বা শল্য চিকিৎসার চেয়ে এটি বেশ সহজ।

ক্রায়ােসার্জারিতে তথ্য ও যােগাযােগ প্রযুক্তির ভূমিকা:
১. ক্রায়ােসার্জারিতে আক্রান্ত কোষ নির্ণয়ে এবং সমস্ত কার্যাবলি পর্যবেক্ষণের কাজে কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা ব্যবহৃত হয়।
২. তাপমাত্রার প্রয়ােগ ও পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহার করা হয়।
৩. ক্রায়ােসার্জারি চিকিৎসাব্যবস্থায় অভিজ্ঞ করে তুলতে ডাক্তারদের প্রশিক্ষণে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ব্যবহার করা হয়।
৪. ক্রায়ােসার্জারি সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির সরবরাহে ও মানােন্নয়নে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।

ক্রায়োসার্জারির সুবিধা - বিশেষ করে ক্যান্সার চিকিৎসায় অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতির তুলনায় এর সুবিধা বেশি। এ পদ্ধতিতে ব্যথা, রক্তপাত কিংবা অপারেশন জনিত অন্যান্য জটিলতা অনেক কম থাকে। হাসপাতাল ও চিকিৎসা ব্যয় তুলনামূলক অনেক কম এবং কোনাে কোনাে ক্ষেত্রে হাসপাতালে থাকার প্রয়ােজন পর্যন্ত হয় না। কখনাে কখনাে ক্রায়ােসার্জারি তাৎক্ষণিক অবশ কাজেও ব্যবহার করা হয়।

ক্রোয়োসার্জারির অসুবিধা- টিউমার শনাক্তকরণে চিকিৎসকগণ ইমেজিং টেস্টের মাধ্যমে শরীরের অভ্যন্তরে এর উপস্থিতি জানার চেষ্টা করেন। এক্ষেত্রে যথাযথ অবস্থান নির্ণয় না করা গেলে টিউমার অপসারণের ক্ষেত্রে ক্রায়ােসার্জারির ব্যবহারে ক্যান্সার কোষ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

��একটি মন্তব্য করুন��

নবীনতর পূর্বতন