ইতিহাস জ্ঞানের এক উজ্জ্বল শাখা। এই শাখায় যতই বিচরন করা যায় ততই যেন উৎকর্ষ বৃদ্ধি পায়। ইতিহাসের যতগুলো প্রাচীন শাখা রয়েছে বৈদিক সভ্যতা তার মধ্যে অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ  মানব সভ্যতার ইতিহাসে বৈদিক সভ্যতা এক অন্য রকম গুরুত্ব বহন করে। খ্রিস্টপূর্ব (১৫০০-৫০০) থেকে মূলত বৈদিক যুগের শুরু। প্রস্তর যুগ (৭০,০০০-৩৩০০ খ্রি:পূ:), মেহেড়গর (৭০০০-৩৩০০ খ্রি:পূ:) এবং হরপ্পা ও মহেঞ্জাদড়ো সভ্যতার (৩৩০০-১৭০০ খ্রি: পূ:) পরই আগমন ঘটে বৈদিক সভ্যতার। অর্থাৎ ইসলামিক যুগের ও বহু আগে এই সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। কিছু ইতিহাসবিদ মনে করেন— দ্বিতীয় হিমবাহের যুগ থেকে বৈদিক সভ্যতার শুরু হয়।এই বৈদিক সভ্যতার অনুসারীগন ই বর্তমানে সনাতনী বা হিন্দু নামে পরিচিত।
প্রাচীন বৈদিক সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই সভ্যতার  ইতিহাসে আর্য জাতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর্যদের আগমনের মধ্যে দিয়েই প্রাচীন  বৈদিক সভ্যতার ভিত্তি স্থাপিত হয় ।‘আর্য’ দিয়ে জাতি বোঝালেও এটি মূলত একটি ভাষার নাম। মজার ব্যাপার হচ্ছে সংস্কৃত ভাষার সাথে যে অন্য অন্তর্নিহিত সম্পর্ক আছে তা প্রথম তুলে ধরেন একজন বিদেশী নাগরিক ,যার নাম উইলিয়াম জোনস। উইলিয়াম জোনস ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁর এশিয়াটিক সোসাইটির বক্তৃতামালায় প্রথমবারের মত সংস্কৃত ভাষার সাথে প্রাচীন গ্রীক, ল্যাটিন, জার্মান, পারসিক, কেলটিক প্রভৃতি ভাষার অন্তর্নিহিত সম্পর্কের কথা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। তিনি বলেন এই সমস্ত ভাষা গুলো একই মূল ভাষা হতে উৎপন্ন । কারণ, সংস্কৃত মূল ভাষা মূলত আর্য ভাষা থেকে উৎপন্ন। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে সংস্কৃতভাষী ভারতীয় আর্যদের সাথে ইউরোপীয় ও মধ্য এশিয়ার আর্য ভাষাভাষীদের মধ্যে সাদৃশ্য ছিল।

যারা আর্য ভাষায় কথা বলত তাদেরকেই মূলত  আর্য জাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এরা মূলত দুই ভাগে বিভক্ত: একটি ইউরোপে বসবাস করত এবং অপরটি  ভারতীয় উপমহাদেশ ও এশিয়া মাইনরে বসবাস করা শুরু আর্যদের আগমন নিয়ে ইতিহাসবিদদের বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ম্যাকডোনাল ও গিল এর মতে,‘ হাঙ্গেরি, অস্ট্রিয়া ও চেকোশ্লোভাকিয়া নিয়ে ইউরোপের যে অঞ্চল গঠিত, সেটাই ছিল আর্যদের আদি বাসস্থান।’ আরেক বিখ্যাত ঐতিহাসিক "রমেশ চন্দ্র মজুমদার" বলেন, দক্ষিণ রাশিয়া ছিল আর্যদের আদি ভূমি। 

আর্যদের আগমন নিয়ে বিভিন্ন মতভেদ থাকলেও এটা  পরিষ্কার যে, আনুমানিক খ্রীস্টপূর্ব ২০০০ অব্দে পূর্ব ইউরোপের পোল্যান্ড থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত যে বিস্তীর্ণ তৃণভূমি অঞ্চল রয়েছে সেখানে  আর্যরা বসবাস করত। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অভ্যন্তরীন কলহ, খাদ্যের অভাব প্রভৃতি সমস্যার কারনে তারা নিজেদের আদিভূমি ত্যাগ করে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। সেদিক থেকে বর্তমান ইরানীরাও এই আর্যজাতির বংশধর। 

আর্যদের অপর একটি শাখা উত্তর-পশ্চিম গিরিপথ দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে।  অনুমান করা যায় যে, খ্রীস্টপূর্ব ১৪০০-১৫০০ অব্দে আর্যরা ভারতে অনুপ্রবেশ করে। আর্যদের প্রভাব-প্রতিপত্তি মূলত উত্তর ভারতেই বেশি ছিল। কিন্তু  দাক্ষিণ ভারতে এই আর্য সভ্যতা এতটা আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি। 

সিন্ধু নদী বিধৌত ভূমিতে তারা তাদের  সভ্যতা গড়ে তোলে। বৈদিক সাহিত্যে এই অঞ্চলকে ‘সপ্ত সিন্ধু’ নামে চিন্হিত করা হয়েছে। সিন্ধু, ইরাবতী, শতদ্রু, চন্দ্রভাগা, স্বরস্বতী, বিপাশা, বিতস্ত, এই সাতটি নদীকে ঘিরেই আর্যদের সভ্যতা গড়ে ওঠে। কিন্তু  ঐ অঞ্চলের আদি অধিবাসীরা কিন্তু আর্যদের এই অনুপ্রবেশকে মেনে নিতে পারেনি। ফলে দীর্ঘকাল ধরে তাদের  যুদ্ধ চলতে থাকে এবং যুদ্ধে পারদর্শী আর্যরা তাদের শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করে। পরাজিত আদিবাসীরা  পাহাড় ও বন-জঙ্গলে গিয়ে বসবাস করা শুরু করে এবং অন্যরা আর্য সমাজের নিম্ন শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত হয়ে জীবন ধারণ করতে থাকে। আর্যরা এদের দস্যু, দাস, অসুর, রাক্ষস প্রভৃতি নামে অভিহিত করত। এদের বলা হত অনার্য।

বৈদিক যুগের সামাজিক অবস্থা:
বর্তমান হিন্দু সমাজে জাতিভেদ যে প্রথাটি , প্রাচীন বৈদিক সমাজে এই প্রথাটি ছিলনা। অনার্যদের সাথে সংমিশ্রিত হয়ে এই  নতুন ভাবধারার উদ্ভব হয়। সমাজে অর্থনৈতিক শ্রেণী থাকলেও বংশীয় শ্রেণীভেদ ছিলনা কিন্তু কালক্রমে তাদের মাঝে জাতিভেদ প্রথা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সমাজকে  চার ভাগে বিভক্ত ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র- এই চার ভাগে ভাগ করা হয় । প্রাচীন বৈদিক যুগের শেষদিকে এই জাতিভেদ প্রথা মারাত্মক আকার ধারণ করে। সমাজে কৌলিণ্য প্রথা বেড়ে যায়। তবে এই জাতিভেদ প্রথাটি তৎকালীন ক্ষমতাধররা তাদের স্বার্থ চরিতার্থে প্রচলন করে থাকে। পবিত্র বেদে কোনো জাতি ভেদের উল্লেখ নেই। 

বৈদিক সমাজে ‘চতুরাশ্রম’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এর মাধ্যমে মানবজীবনকে চারটি পর্যায়ে ভাগ করা হয় । এই চারটি ভাগের  প্রথম জীবন ছিল ব্রম্মচর্য। এই সময় প্রত্যেক আর্য বালক উপনয়নের পর তার  গুরুর গৃহে থেকে বিদ্যা লাভ  করত এবং গুরুর সেবা করত। বিদ্যালাভ শেষে গার্হাস্থ্য আশ্রম শুরু করতে হত অর্থাৎ, বিয়ে করে সংসার জীবন শুরু করতে হত। 
তারপর শুরু হত বাণপ্রস্থাশ্রম।বনে কুটির বেঁধে নির্লিপ্ত জীবন-যাপনই ছিল এর প্রধান উদ্দেশ্য। শেষ পর্যায়টি হল ‘সন্ন্যাস’ বা ‘যতি-আশ্রম’। এ পর্যায়ে এসে সবাইকে সন্ন্যাসীর মত জীবন যাপন করতে হত।

বৈদিক সমাজে নারীর স্থান:
 বৈদিক সমাজে নারীর অবস্থান ছিল অত্যন্ত উঁচু এবং সম্মানজনক। শিক্ষা, অস্ত্র বিদ্যা, রাজকার্য, কৃষি , ব্যবসা প্রভৃতি সকল ক্ষেত্রে  নারীরা পুরুষের সমান মর্যাদা লাভ করতেন। গৃহস্থালীর বিষয়ে নারীর সর্বময় কর্তৃত্ব ছিল। সমাজে পুত্র সন্তানের প্রতি ঝোঁক থাকলেও, কন্যা সন্তাকে অবহেলা করা হতনা। সমাজে নারীকে দেবী নামে সম্বোধন করা হত। নারীর প্রতি নিপীড়নের শাস্তি ছিল ভয়াবহ। বৈদিক যুগে কয়েকজন বিখ্যাত নারী ঋষি ছিলেন যারা বেদ মন্ত্র দ্রষ্টা ছিলেন,  এরা হলেন: লোপামুদ্রা, মমতা, ঘোষা, বিশ্ববারা, অপালা প্রমুখ । সাহিত্য রচনায় ও নারীদের ভূমিকা ছিল।

বৈদিক যুগের ধর্মীয় অবস্থা:
ঘোষা, বিশ্ববারা, অপালা প্রমুখ । সাহিত্য রচনায় ও নারীদের ভূমিকা ছিল। ‘বেদ’ ছিল সমাজের ধর্মীয় জীবনের মূল ভিত্তি। বেদকে বলা হয় "অপৌরোষেও" অর্থাৎ স্বয়ং  ঈশ্বর এর স্রষ্টা।  ‘বেদ’ শব্দটি ‘বিদ’  থেকে উৎপন্ন। এটি  সংস্কৃত ভাষায় রচিত। বেদ ও অন্যান্য  বৈদিক সাহিত্যগুলি আনুমানিকভাবে খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০-১০০০ অব্দের মধ্যে রচিত বলে ধরা হয়।  সমগ্র বিশ্ব সাহিত্যে বেদ একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে। বেদ মূলত  চারভাগে বিভক্ত, যথা—ঋক, সাম, যজুঃ ও অথর্ব। আবার এই প্রত্যেকটি বেদ সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ এই চারভাগে বিভক্ত। কোনো  সাহিত্যিক বা দূতের মাধ্যমে এই  বেদ রচনা হয়নি । ভিন্ন ভিন্ন সময়ে, ভিন্ন ভিন্ন ঋষি ও মহাপুরুষগণ তাদের ধ্যানে ঈশ্বর কর্তৃক যে বাণী  প্রাপ্ত হতেন, সেটাই বেদে লিপি বদ্ধ করেছেন। কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন মূলত বেদের বেশীর ভাগ বাণী লিপিবদ্ধ করেছিলেন ঐবং তিনি বেদকে চার ভাগে বিভক্ত করেন। তাই তিনি "বেদব্যাস " নামে বিখ্যাত।

উনবিংশ শতাব্দীতে প্রাপ্ত ঋগবেদের স্তোত্র বা বাণী গুলো  সেই সময়ের সর্বাপেক্ষা প্রাচীন ও সাহিত্যের মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হত। প্রকৃতির অধিষ্ঠাতা দেবতাদের উদ্দেশ্য করে  এই বেদে ১০২৮টি ঋক বা স্তোত্রের বিবরণ রয়েছে। ঊষা, উন্দ্র, আকাশ, সূর্য, অগ্নি প্রমুখ দেবতার স্তুতি করা হয়েছে। অন্যদিকে সামবেদ যা  ঋগবেদ হতেই সংকলিত  তাতে ছন্দ, মাত্রা, সুর ও সঙ্গীত সংমিশ্রিত হয়েছে। যজুর্বেদ হল গদ্য এবং পদ্যের সংমিশ্রণ। এতে যাজ্ঞকর্মের পরিপূর্ণ বিবরণ ও বিভিন্ন মন্ত্র তুলে ধরা হয়েছে। বেদের শেষ স্তর হল অথর্ব বেদ।এই বেদে অনেক উপাসনার ইঙ্গিত, ঔষধপত্রের আলোচনা ওবিভিন্ন মন্ত্র উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রাচীন বৈদিক যুগে বর্তমান সনাতন বা হিন্দু ধর্মের মত প্রতিমা পূজা প্রচলিত ছিলনা। আর্যরা প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তির প্রতি বিস্মিত হয়ে ভক্তি সহকারে দেব-দেবীরূপে তাদের উপাসনা করতে থাকে। জলের দেবতা বরুণ, বজ্রের দেবতা ইন্দ্র, ঝড়ের দেবতা মরুৎ, আলোর দেবতা সূর্যের ,  অগ্নি, বায়ু, উষা দেবীর উপাসনা করা হত। বিভিন্ন দেবতার আরাধনা করলেও আর্য বা বর্তমান সনাতনীরা মূলত একেশ্বরবাদী।এই  সম্পর্কে বৈদিক সাহিত্যে অনেক স্তোত্র ও  পাওয়া যায়। অর্থাৎ সমস্ত দেবদেবী এই ঈশ্বরের বিভিন্ন শক্তির প্রকাশ মাত্র। সেসময় আর্যরা দেবতাদের সন্তুষ্ট করার জন্য অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দিত। এছাড়া বড় আকারে যজ্ঞের আয়োজন করা হত। বৈদিক বা সনাতনী ধর্মানুসারে জীব হত্যা মহা পাপ।বর্তমানে অনেক স্থানে পশু বলি দেওয়া হয় যা বৈদিক রীতি এবং বেদ বিরুদ্ধ।

বৈদিক যুগের অর্থনৈতিক অবস্থা:
বৈদিক সভ্যতা ছিল গ্রামকেন্দ্রীক। গ্রামকে ঘিরেই তাদের প্রশাসন, অর্থনীতি, সামাজ জীবন ও ধর্মীয় জীবন পরিচালিত হত। সেই  যুগের অর্থনীতির মূল চালিকা  ছিল কৃষিকাজ ও পশুপালন। প্রতিটি পরিবারেই নিজস্ব কৃষি জমি ছিল এবং প্রত্যেকে চাষাবাদের করত।  প্রতিটি গ্রামেই পশুচারণের জন্য  ভূমি ছিল। আর্যরা গম, যব, ধান, প্রভৃতি খাদ্যশস্য উৎপাদন করত। জমি উর্বর থাকায় তাদের কৃষিকাজ নির্বিঘ্নেই সম্পাদিত হত। যদিও মাঝেমাঝে অনাবৃষ্টি ও প্রাকৃতিক অন্যান্য দুযোর্গ তাদের ভোগান্তি সৃষ্টি করত তারপরও উর্বর ভূমি তাদের জন্য ছিল এক আশীর্বাদ। গরু, ঘোড়া, ছাগল, কুকুর, ভেড়া এসব গৃহপালিত পশু ছিল তাদের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। বৈদিক যুগে শিল্পজাত দ্রব্যের কথাও জানা যায়। বস্ত্রশিল্প, মৃৎশিল্প, চারুশিল্প, ধাতু শিল্প এবং অন্যান্য কারুকার্যের স্বর্নযুগ ছিল তখন। সেই যুগে মুদ্রার প্রচলন ছিলনা। দ্রব্য বিনিময় প্রথার মাধ্যমেই মানুষ অর্থনৈতিক কাজ ও ব্যবসায়িক কাজ সম্পাদন করত। সীমিত আকারে হলেও পণ্য পরিবহনের জন্য যানবাহনের ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। 

প্রাচীন বৈদিক যুগ ছিল পৃথিবীর স্বর্ণ যুগ এবং প্রাচীন স্থাপত্যের এক অনন্য সময়। যদিও বৈদিক যুগের অনেক ইতিহাস ও ঐতিহ্য মুসলিম শাসকদের ধ্বংস লীলার কবলে পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। তারপর তারপরও এখনো যা অবশিষ্ট আছে ,সেটাই তার নিজ মহিমায় উজ্জ্বল। 

অপেক্ষাকৃত নতুন পুরনো