বিজ্ঞানের এক অন্যতম বিস্ময়কর আবিষ্কার হচ্ছে কম্পিউটার। এবং এই কম্পিউটার ক্রমশ আধুনিক থেকে আধুনিকতার হচ্ছে। বৃদ্ধি পাচ্ছে এর ব্যবহার প্রণালী এবং কাজের দক্ষতা। তবে কম্পিউটার আবিষ্কারের প্রথম দিক থেকে আজকের এই বর্তমান কম্পিউটারের মত এত উন্নত কম্পিউটার ছিল। এবং এটিকে বর্তমানের এই আধুনিক কম্পিউটারের রূপান্তরিত করতে বহু বিজ্ঞানির সারা জীবনের সাধনা পার করে দিয়েছেন। তাদের সকলের নিরলস প্রচেষ্টা এবং মেধার কারণেই আমরা আজকের এই কম্পিউটার দেখতে পাই। বর্তমান সময়ে কম্পিউটার ব্যবহার হয় না এমন ক্ষেত্র খুঁজে পাওয়া খুব দুষ্কর। চলুন তাহলে আমরা কম্পিউটারের ইতিহাস ও কম্পিউটার আবিষ্কার এবং ইতিহাস ৩টি যুগে ভাগ করা হয়। এগুলো হলো, কম্পিউটারের প্রাথমিক যুগ, ইলেকট্রো মেকানিক্যাল যুগ এবং ইলেকট্রনিক যুগ আসুন এই তিনটি যুগ বিভাগ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য আলোচনার মাধ্যমে জেনে নেই।

কম্পিউটারের ইতিহাস
কম্পিউটারের প্রাথমিক যুগ: প্যাস্কালের পরে ১৬৭১ সালে এক জার্মান গণিতবিদ গটফ্রুহিড ভন লিবনিজ (Gottfried Von Leibniz) প্যাস্কালের যন্ত্রের ভিত্তিতে আরও উন্নত যান্ত্রিক গণনাযন্ত্র তৈরি করেন। তাঁর এ যন্ত্রের সাহায্যে যােগ, বিয়ােগ, গুণ, ভাগ এবং উৎপাদক নির্ণয় করা যেত। তিনিই প্রথম পুনঃপুন যােগের মাধ্যমে গুণ করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। স্টেপ ও রেকোনার নামের এই যন্ত্রটি তৈরির প্রায় একশ বছর পর ১৭৮৬ সালে জোহান হেশেফ মুলার একটি গণনা যন্ত্রের ধারণা উপস্থাপন করেন। ১৮০১ সালে ফ্রান্সের জোসেফ মেরী জেকার্ড পাঞ্চকার্ড ব্যবহার শুরু করেন। 

বর্তমান কম্পিউটারের অভিধারণা বিশিষ্ট স্বয়ংক্রিয় গণনা যন্ত্র তৈরির চেষ্টা করেন অধ্যাপক চার্লস ব্যাবেজ (Charles Babbage) ১৮০১ সালে। তিনি তাঁর প্রস্তাবিত যন্ত্রের নাম ঘােষণা করেন 'এ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন (Analytical Engine)। চার্লস ব্যাবেজ তাঁর সময়ে একজন শীর্ষস্থানীয় গণিতবিদ হিসেবে খ্যাত ছিলেন।

[ কম্পিউটার আবিষ্কারের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস]

১৮২৮ সালে তিনি ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে লুকাসিয়ান অধ্যাপক (Lucasian Professor) হিসেবে নিযুক্ত হন। তাঁর আগে লুকাসিয়ান অধ্যাপকের সম্মান লাভ করেছিলেন বিজ্ঞানী নিউটন। কিছুটা রগচটা মেজাজের মানুষ ব্যাবেজ তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করেছেন তখনকার জন্য অবিশ্বাস্য রকম একটি জটিল যন্ত্র তৈরির চেষ্টায়।

তিনি এমন একটি যন্ত্রের কথা চিন্তা করেছিলেন, যে যন্ত্রে পাঞ্চকার্ডের সাহায্যে ইনপুট প্রদান করা হবে। ইনপুট ধারণের জন্য যন্ত্রটিতে থাকবে স্মৃতির ব্যবস্থা, প্রক্রিয়াকরণের জন্য গাণিতিক অংশ বা মিল (Mill) এবং স্বয়ংক্রিয় আউটপুট মুদ্রণের ব্যবস্থা। প্রক্রিয়াকরণের কাজ পরিচালনার জন্য থাকবে পর্যায়ক্রমিক প্রােগ্রাম নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। সমসাময়িক বিজ্ঞানীরা তাঁর চিন্তাকে 'ব্যাবেজের মূর্খতা (Babbage's Folly) বলে উপহাস করতেন। প্রকৃতপক্ষে চার্লস ব্যাবেজের চিন্তা ছিল শত বছরের আগাম চিন্তা। অর্থাৎ চার্লস ব্যাবেজের চিন্তার একশ বছর পর কমিপউটার যে পর্যায়ে উপনীত হয়, সেইবূপ কম্পিউটারের চিন্তা তিনি একশ বছর আগে করেছিলেন।

১৮৩৩ সালে তার পরিকল্পিত এ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন-এর ধারণাকে আধুনিক কম্পিউটারের সূত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এজন্য চার্লস ব্যাবেজকে কম্পিউটারের জনক হিসেবেও অভিহিত করা হয় চার্লস ব্যাবেজের পরিকল্পিত এ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিনের নক্সা প্রণয়নের ব্যাপারে তাঁকে সর্বতােভাবে সাহায্য করেন ঐ সময়ের আর একজন খ্যাতিমান গণিতবিদ, বিখ্যাত ইংরেজ কবি লর্ড বায়রনের কন্যা, লেডি এডা (Lady Augusta Ada Lovelace) । তাকেই বিশ্বের প্রথম কমিপউটার প্রােগ্রামার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাঁর সম্মানের জন্য ১৯৮০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় একটি আধুনিক কম্পিউটার প্রােগ্রামিং ল্যাংগুয়েজের নাম প্রদান করে এডা (Ada)। চার্লস ব্যাবেজের যন্ত্রটি বাস্তব রূপ পায়নি। তাকে যে সরকারি সহায়তা দেওয়া হত সময়মতাে কাজ সম্পন্ন করতে না পারায় তাও এক সময়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু চার্লস ব্যাবেজের পুত্র হেনরি ব্যাবেজ পিতার ধারণা অনুযায়ী একটি এ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন তৈরি করেন।

[ কম্পিউটার হার্ডওয়্যার এবং সফটওয়্যার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা]

১৮৭১ সালে চার্লস ব্যাবেজের পরলােক গমনের পর থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত প্রায় পৌনে এক শতাব্দী কম্পিউটারের উন্নয়ন প্রক্রিয়া বলতে গেলে থেমে থাক। এ সময়ে পাঞ্চকার্ড দিয়েই উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণের কাজ চলেছে । উল্লেখ করা যেতে পারে যে, এই সময়কালে যেসব যন্ত্র প্রচলিত হয় তার মাঝে রয়েছে ১৮৮৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডর ফেন্ট-এর কম্পােসিটার, ১৯৮৮ সালে প্রচলিত উইলিয়াম বারােস- এর এ্যাডিং এন্ড লিস্টিং মেশিন ইত্যাদি।

ইলেকট্রো মেকানিক্যাল যুগ : ১৮৮০ সালেও আমেরিকায় উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণের কাজ করা হত কলম, পেন্সিল ও রুলারের সাহায্যে। কিন্তু ঐ সময় উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণের কাজ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছিল । হাতে-কলমে উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণের ফলাফলে প্রায় ভুল ধরা পড়ত এবং কাজের সময়ও লাগত অনেক বেশি । উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে,আমেরিকার ১৮৮০ সালের শুমারি (Census) শেষ করতে করতে প্রায় ১৮৯০ সালের শুমারির কাজ শুরু করার সময় পর্যন্ত গড়িয়েছিল। তবে সৌভাগ্যের বিষয়, একই সময় উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণের জন্য উন্নত মানের ও দক্ষ ইলেকট্রো মেকানিক্যাল পাঞ্চকার্ড যন্ত্র তৈরি হয়।

আমেরিকার শুমারি সমস্যা সমাধানের জন্য সেন্সাস ব্যুরাে (Bureau of Census)-এর পরিসংখ্যানবিদ ড. হারম্যান হলেরিথ (Dr. Herman Hollerith) ১৮৮৭ সালে মেশিনের সাহায্যে পাঠযােগ্য অভিধারণা (Concept)- এর ভিত্তিতে ‘সেন্সস মেশিন’ নামে একটি যন্ত্রের নক্সা প্রণয়ন করেন। পরীক্ষামূলক চালনায় দেখা যায় ড. হলেরিথের সেন্সাস মেশিনের সাহায্যে উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণের জন্য সময় লাগে পূর্বের তুলনায় মাত্র আট ভাগের এক ভাগ। ফলে হলেরিথের সেন্সস মেশিনের সাহায্যেই আমেরিকার ১৮৯০ সালের শুমারির কাজ সম্পন্ন করা হয়।

১৮৮০ থেকে ১৮৯০ সাল। এই দশকে আমেরিকার জনসংখ্যা ৫ কোটি থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৬ কোটি ৩০ লাখে দাড়িয়েছিল । হলেরিথের যন্ত্রের সাহায্যে ৩ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ১৮৯০ সালের শুমারির কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছিল। ড, হলেরিথ ১৮৯৬ সালে তার উদ্ভাবিত যন্ত্র বাণিজ্যিক ভাবে তৈরি ও বিক্রয়ের জন্য কোম্পানি গঠন করেন।

পরবর্তীতে তার কোম্পানি আরও কয়েকটি কোম্পানির সঙ্গে একীভূত হয়ে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস মেশিন বা আইবিএম (IBM-International Business Machine) নামে কোম্পানি গঠিত হয় ।

পাঞ্চকার্ডে বর্গাকার ছিদ্রের সাহায্যে তৈরি সংকেতায়নের মাধ্যমে উপাত্ত সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। এরপর কার্ড গুলাে ইলেকট্রো মেকানিক্যাল যন্ত্রে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়। এ যন্ত্র পাঞ্চকার্ডের উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণের কাজ সম্পন্ন করে।

কিন্তু পাঞ্চকার্ডের ট্রে বদল করা, মেশিনে প্রবেশ করানাে, মেশিন থেকে বের করা, কোনাে মেশিন চালু করা, কোনােটি থামানাে ইত্যাদি কাজগুলাে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরই হাতে ধরে করতে হত । কম্পিউটার যন্ত্র উদ্ভাবিত হওয়ার পরই এসব কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পদিত হওয়ার সুযােগ সৃষ্টি হয় ।

ইলেকট্রনিক যুগ: ইলেকট্রনিক কম্পিউটারের চিন্তা প্রথম শুরু করেন পদার্থবিদ্যা ও গণিতের অধ্যাপক ড, জন ভিনসেন্ট আটানাসফ (Dr. John Vincent Atanasoff)। তার গণনা কাজের জন্য উপযুক্ত যন্ত্র তখন পাওয়া যেত না।

তাই তিনি নিজেই উন্নত ধরনের গণনা যন্ত্র তৈরির পরিকল্পনা করেন এবং ১৯৩৭-৩৮ সালের মধ্যে ইলেকট্রনিক কম্পিউটার তৈরি করেন। তার ও তার সহযােগীদের নাম অনুসারে যন্ত্রটির নাম রাখা হয় আটানাসফ-বেরি কম্পিউটার (Atanasoff-Berry Computer'), সংক্ষেপে এবিসি (ABC)। এবিসি কম্পিউটারেই প্রথম মজুদ (Storage) এবং গাণিতিক/যুক্তিমূলক কাজের জন্য ভ্যাকুয়াম টিউব (Vacuum Tube) ব্যবহার করা হয়। লন্ডন শহর থেকে ৪০ মাইল দূরে সামরিক বাহিনীর কোড এন্ড গাইডার স্কুলে এই প্রকল্পের কাজ করা হয়েছিল । এবিসি কম্পিউটার তৈরি করা হয়েছিল শুধুমাত্র গাণিতিক সমীকরণ জাতীয় কাজের বা সমস্যা সমাধানের জন্য। ড. আটানাসফ এবং বেরি ১৯৪০-১৯৪১ সালের মধ্যে জন মউসলি (John W. Mauchly)-এর সঙ্গে দেখা করে তাদের তৈরি যন্ত্র দেখান। জন মউসলি তখন পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মুর কুল অব ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে কর্মরত ছিলেন। জন মউসলি তখন বহুমুখী কম্পিউটার তৈরির চিন্তা শুরু করেন এবং চল্লিশের দশকের গােড়ার দিকে তাঁরই ছাত্র জে. প্রেসপার একার্ট (J. Presper Eckert)-এর সহযােগিতায় কাজ শুরু করেন।

১৯৩৭ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত গণিতের, অধ্যাপক হওয়ার্ড আইকেন (Howard G. Aicken) স্বয়ংক্রিয় গণনাযন্ত্র তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করেন । হলেরিথের পাঞ্চকার্ড প্রযুক্তির সঙ্গে।

বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক পদ্ধতির সমন্বয় ঘটিয়ে তিনি তাঁর স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। আইবিএম কোম্পানির প্রকৌশলীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি ১৯৪৪ সালের মধ্যে তার যন্ত্রটি তৈরি করতে সক্ষম হন। যন্ত্রটি মার্ক-১ (Mark-1) ডিজিটাল কম্পিউটার নামে প্রচলিত হয়। গণনা যন্ত্রটির অভ্যন্তরীণ কাজ।

বিদ্যুৎচুম্বকীয় রিলে (Electromagnetic Relay)-এর সাহায্যে নিয়ন্ত্রিত হত । গাণিতিক কাজ সম্পাদনের অংশ ছিল যান্ত্রিক (Mechanical) । গঠন প্রকৃতির দিক থেকে মার্ক-১ ছিল ইলেকট্রো মেকানিক্যাল কম্পিউটার। বৈশিষ্ট্য গতভাবে এর অনেক কিছুই চার্লস ব্যাবেজের পরিকল্পিত যন্ত্রের সঙ্গে মিল ছিল।

অপেক্ষাকৃত নতুন পুরনো