রচনাঃ বৃক্ষরােপণ অভিযান
অথবা, পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন।
অথবা, সামাজিক বনায়ন

[সংকেত: ভূমিকা—মানুষ ও বৃক্ষ বৃক্ষের প্রয়ােজনীয়তা বনের ওপর বর্তমান সভ্যতার প্রভাব বাংলাদেশের বনের অবস্থা বৃক্ষরােপণ অভিযান-বেসরকারি উদ্যোগ-উপসংহার]
বৃক্ষ রোপন
বৃক্ষ রোপন রচনা
ভূমিকা: আধুনিক বৈজ্ঞানিক সভ্যতার অপরিমেয় অগ্রগতি মানুষকে যেমন অশেষ কল্যাণ দান করেছে তেমনি তার জীবনকে সমূহ বিপদ ও অমঙ্গলের আশঙ্কায় শঙ্কিত করে তুলেছে। বর্তমানকালের উন্নত মানব সভ্যতার প্রস্ফুটিত রঙিন পুষ্পের অভ্যন্তরে দুষ্ট কীটের মতাে প্রকট হয়ে উঠেছে নানাবিধ প্রাণঘাতী মারাত্মক সমস্যা, যা জীবনকে চরম ভীতি ও বিপর্যয়ের মধ্যে নিপতিত করছে। বৈজ্ঞানিক সভ্যতার দুরারােগ্য সংক্রামক ব্যাধি এ পরিবেশ দূষণ যে বিষাক্ত কালনাগিনীর মতাে ফণা বিস্তার করে মরণ ছােবল হানতে উদ্যত হয়েছে, তা প্রতিকারের জন্য আজ মানুষ বিশ্বব্যাপী কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। বৃক্ষরােপণ' এ পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশবিশেষ। দক্ষিণ এশিয়ার বিপুল জনঅধ্যুষিত, দারিদ্র্যপীড়িত, বঙ্গোপসাগরের উপকূলে অবস্থিত পলিমাটি গঠিত বিশ্বের এ বৃহত্তম ব-দ্বীপ, উন্নয়নশীল বাংলাদেশেও এ বৃক্ষরােপণ অভিযান একটি জাতীয় মহাপরিকল্পনা রূপে সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিশ্ববরেণ্য কবি ও নাট্যকার William Shakespear তাঁর কবিতায় বন-বিটপীর ঘন বীথিকায় সহজ সরল, শান্তিময়, উদ্বেগহীন জীবন যাপন করার যে আহ্বান জানিয়েছিলেন, আমাদের পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের দরদভরা মধুর কণ্ঠের নিমন্ত্রণে “গাছের ছায়ায় লতায়-পাতায় উদাসী বনের বায়” ফিরে যাবার যে আহ্বান ধ্বনিত হয়েছে, সেই সৌন্দর্যহীন কৃত্রিম সভ্যতার সংকীর্ণ অশান্তিময় পরিবেশে অরণ্যের শ্যামল ছায়াময় ছায়ানীড়কে ফিরে পাবার যে উদগ্রীব বাসনা রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাব্যে ব্যক্ত করেছিলেন, আজকের বৃক্ষরােপণ অভিযানে আমরা আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সেই কালােত্তীর্ণ কবির আত্মবিবেক বাণী আর ক্রন্দন ধ্বনিকেই গভীর আকাঙ্ক্ষায় যে পুনরাবৃত্তি করছি—আজ তা কজন ভাবতে পারছে।

📖 রচনা সমগ্রঃ শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা

মানুষ ও বৃক্ষ : বসুন্ধরার বুকে প্রথম প্রাণের অস্তিত্ব নিয়ে উদ্ভিদের আবির্ভাব হয়েছিল। এরপর এলাে মানুষ। তাই আদিযুগে মানুষ অরণ্যেই বাস করত, বৃক্ষলতাই ছিল মানুষের সাথী। মানব সভ্যতার শুভ উন্মেষ ঘটেছিল অরণ্যের শ্যামল ছায়া শােভিত মিথ রমণীয়তায়, বৃক্ষলতা আচ্ছাদিত স্নেহনীড়ে। প্রকৃতির অবারিত পরিসরে বসবাসকারী মানুষের জীবনের প্রয়ােজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর যােগান দিয়ে অরণ্যই মানুষের জীবনকে মৃত্যুঞ্জয়ী মহিমায় বিকশিত হতে সাহায্য করেছিল। তাই বনাঞ্চলের সাথে মানুষের জীবনের সম্পর্ক অতি গভীর ও অবিচ্ছেদ্য।

বৃক্ষের প্রয়ােজনীয়তা : বৃক্ষ মানুষের পরম উপকারী বন্ধু। এটি আমাদেরকে খাদ্য, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিলিয়ে যেমন উপকার করে, তেমনি এর সৌন্দর্য হৃদয়কে আপুত করে। বৃক্ষ দেশের আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করে। বৃক্ষ আবহাওয়া ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে, বাতাসে জলীয় বাষ্পের ক্ষমতা বাড়িয়ে আবহাওয়াকে শীতল রাখে। প্রচুর বৃষ্টিপাতে বৃক্ষরাজি বিশেষ সহায়ক। কোনাে অঞ্চলের গাছপালা সেখানকার পানিপ্রবাহকে অনেকখানি নিয়ন্ত্রণ করে ভূমিক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করে। গাছপালা, মূল ভূ-ভাগ ও নতুন সৃষ্ট চরাঞ্চলকে নদীর ভাঙন, বৃষ্টিপাত ও পানিস্ফীতির হাত থেকে রক্ষা করে। এটি মাটির স্থিতিশীলতাকে বজায় রাখে। অঞ্চল বিশেষের পানি সংরক্ষণ এবং বৃষ্টি নিয়ন্ত্রণেও সেই অঞ্চলের গাছপালা অনেক সাহায্য করে। বৃক্ষরাজি ঝড়-ঝঞা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে বাসগৃহকে রক্ষা করে। জন স্বাস্থ্য রক্ষায় বৃক্ষ বিশেষ ভূমিকা পালন করে। গাছপালা জ্বালানি, গৃহ নির্মাণ ও আসবাবপত্র তৈরির বিপুল চাহিদা মিটিয়ে আমাদের অর্থনৈতিক ও ব্যবহারিক জীবনে যথেষ্ট উপকার করে। বৃক্ষ আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতির বুনিয়াদ। বৃক্ষ আমাদের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আবশ্যক। শিশুর দোলনা থেকে মৃত ব্যক্তির খাট পর্যন্ত যাবতীয় কাজকর্মে কাঠ ও বাঁশ একান্ত প্রয়ােজনীয়। নৌকা, গরুর গাড়ি, বাস, ট্রাক, স্টীমার, লঞ, জাহাজ ইত্যাদি তৈরিতে কাঠ প্রয়ােজন। কাগজ, রেয়ন, দিয়াশলাই, প্যাকিং বাক্স ইত্যাদি বহু শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ হয় বন থেকে।
বনের ওপর বর্তমান সভ্যতার প্রভাব : মানবজীবনের এত উপকারী বনাঞ্চল বিনাশে বর্তমান যুগের মানুষ যে ভূমিকা পালন করছে তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। সভ্যতার ক্রমবিবর্তনে, জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে, জীবনের চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে মানুষ বৃক্ষ নিধনে অধিক তন্সর হয়েছে। কিন্তু যে হারে বনাঞ্চল ধ্বংস হচ্ছে সে অনুপাতে মানুষ বনায়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। ফলে পৃথিবীর আবহাওয়া ও জলবায়ুর ভারসাম্য নষ্ট হয়ে বন্যা, খরা ইত্যাদির প্রকোপ বেড়ে গেছে। পৃথিবীর পাঁচ হাজার বছর পূর্বের উন্নত সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংসের অন্যতম কারণ ছিল সেখানে অপরিমেয়। নিধনের ফলে উক্ত খরা ও বন্যার প্রকোপ। আমাদের চোখের সামনে বর্তমানে ইথিওপিয়ার অনাবৃষ্টি, দুর্ভিক্ষ ও মহামারির কারণ যে সেখানকার বৃক্ষ সম্পদের ব্যাপক বিনাশ তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কথায় বলে “পাগলেও নিজের ভালাে বােঝে।" কিন্তু মানুষ নিজের মঙ্গল না বুঝে বনজ সম্পদ নষ্ট করে খাল কেটে কুমির আনতে ব্ৰতী হয়েছে। ফলে আগামীতে বিশ্ববাসীর অস্তিত্ব যে মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হবে তা সম্যকভাবে সবাই উপলদ্ধি করতে পারছে না। বিশ্বের বনজ সম্পদ ধ্বংস করে, গাছপালা নষ্ট করে মানুষ আজ পৃথিবীতে সৌন্দর্যহীনতা, শুষ্কতা, অনুর্বরতা, বন্যা, খরার শিকার হচ্ছে।

📖 রচনাঃ অধ্যবসায়!

বাংলাদেশের বনের অবস্থা : যে কোনাে দেশের জন্য মূল ভূখণ্ডের শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা দরকার। কিন্তু সে তুলনায় বাংলাদেশের বনভূমির পরিমাণ মােট আয়তনের ১৭ ভাগ। বাংলাদেশের বনভূমি মাত্র ২৫,০০০ বর্গ কিলােমিটার । কিন্তু দুঃখের বিষয় বাংলাদেশের বনের পরিমাণ প্রয়ােজনের তুলনায় অপ্রতুল হলেও তা বৃদ্ধির জন্য উদ্যোগের অভাব যথেষ্ট। অহরহ আমরা কারণে অকারণে আমাদের আশপাশ থেকে নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন করে চলছি। নির্বিচারে বনভূমি ধ্বংসের ফলে সুজলা-সুফলা বাংলাদেশ পরিবেশ দূষণের শিকার হচ্ছে। ফলে প্রয়ােজনের তুলনায় বৃষ্টিপাত কমে গিয়ে আকস্মিক বন্যা, জলােচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ে প্রতি বছর বাংলাদেশ হচ্ছে বিপর্যস্ত। জলবায়ু এগিয়ে চলছে চরম ভাবাপন্ন অবস্থার দিকে।

বৃক্ষরােপণ অভিযান : বৃক্ষ নিধনজনিত অনিবার্য পরিণতির হাত থেকে রেহাই পেতে স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে প্রতিবছর বৃক্ষরোপণ অভিযান পরিচালিত হয়ে আসছে। সাধারণ মানুষের এ অভিযানে শিশু, মেহগনি, সেগুন, ইউক্যালিপটাস, ইপিল-ইপিল, আম, জাম, পেয়ারা, জামরুল প্রভৃতি নানা জাতের বৃক্ষের চারা রােপণের জন্য পূর্বেই সরকারি নার্সারি থেকে চারা সরবরাহের জন্য উৎসাহিত করা হয়। আমাদের উচিত এক বৃক্ষ ছেদনের পূর্বে তার বদলে কমপক্ষে চারটি করে চারা রােপণ করা এবং সেগুলাের যত্ন নেওয়া। কারণ বৃক্ষ আছে বলেই পৃথিবীর মানব সমাজ আজও টিকে আছে।

বৃক্ষ রোপনে বেসরকারি উদ্যোগ : বৃক্ষরােপণ একটি জাতীয় কর্ম। এ ব্যাপারটি সরকারের একক প্রচেষ্টায় সাফল্য লাভ করা কঠিন। তাই সরকারের সাথে এগিয়ে আসতে হবে সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে গ্রামবাসীদের ভূমিকা এতে অধিক প্রয়ােজন। দেশের তরুণরা বৃক্ষরােপণ সমিতি' গঠন করে সংঘবদ্ধ হয়ে স্বস্ব এলাকার রাস্তার পাশে, বাড়ির আশপাশে ফাঁকা জায়গায় বৃক্ষরােপণ ও তা সংরক্ষণের জন্য এগিয়ে আসতে পারে ।
উপসংহার : গাছ লাগান, দেশ বাঁচান'—এ শ্লোগানকে সামনে রেখে আজ আমাদের বৃক্ষ রােপণ অভিযানকে জোরদার করে তুলতে হবে। জাতীয় অর্থনীতিতে বনের গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে সবুজ বিপ্লবের সাথে আমাদের বন সংরক্ষণের শ্লোগানকে তুলে ধরতে হবে। আণবিক বােমার আঘাতে বিদীর্ণ শঙ্কাতুর পৃথিবীতে মানুষের জীবনে বনসংরক্ষণের চেতনায় আসবে প্রাণের বন্যা, সৌন্দর্য ও সুষমা। বন সংরক্ষণ ও বৃক্ষ রােপণ করেই আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে সুন্দর ও উপযােগী করে রাখতে হবে।

��একটি মন্তব্য করুন��

নবীনতর পূর্বতন